বন্ধন সিরিজ (Nusus)
বন্ধন সিরিজ
.
প্রথম পর্ব: মেয়েকে জোরপূর্বক যেকোনো ছেলের সাথে বিয়ে
.
দ্বিতীয় পর্ব: সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারির মাঝে সমন্বয় এবং প্রাধান্য
.
তৃতীয় পর্ব: অস্বচ্ছল ছেলেকে বিয়ে
.
চতুর্থ পর্ব: পাত্র/পাত্রী দ্বীনদার কি না, সেটি বুঝার কিছু উপায়
.
পঞ্চম পর্ব: কেমন মেয়েকে বিয়ে?
.
ষষ্ঠ পর্ব: খারাপ অতীত থাকলে...
.
সপ্তম পর্ব: বিয়েতে কুফু বা সমতা
.
অষ্টম পর্ব: কনে দেখার পদ্ধতি
.
নবম পর্ব: ছেলের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্যের সীমারেখা
.
দশম পর্ব: বিয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ইস্তিখারার আমল
.
একাদশ পর্ব: নির্দিষ্ট কাউকে চাওয়া
.
দ্বাদশ পর্ব: ফাতেমী মোহরানা, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মোহরানার পরিমাণ
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=169677815428930&id=106265848436794
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=169677815428930&id=106265848436794
.
ত্রয়োদশ পর্ব: উত্তম মোহরানার পরিমাণ ও কিছু জরুরি পরামর্শ
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=169872482076130&id=106265848436794
ত্রয়োদশ পর্ব: উত্তম মোহরানার পরিমাণ ও কিছু জরুরি পরামর্শ
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=169872482076130&id=106265848436794
.
চতুর্দশ তথা শেষ পর্ব: বিবাহবহির্ভূত নারী-পুরুষের প্রেমের বিধান এবং রিলেশনে থাকা ব্যক্তিদের করণীয়
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=171904795206232&id=106265848436794
চতুর্দশ তথা শেষ পর্ব: বিবাহবহির্ভূত নারী-পুরুষের প্রেমের বিধান এবং রিলেশনে থাকা ব্যক্তিদের করণীয়
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=171904795206232&id=106265848436794
এর মধ্য দিয়ে আমাদের বন্ধন সিরিজটি সমাপ্ত হলো, আলহামদুলিল্লাহ।
-------------------------------
#বন্ধন (প্রথম পর্ব)
বিয়েতে মেয়েদের পছন্দের গুরুত্ব কতটুকু?
জোরপূর্বক মেয়ে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করা হলো।
.
উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের মেয়েদেরকে ‘অসুন্দর’ ছেলে বিয়ে করার জন্য বাধ্য করবে না। কেননা, তোমরা যা (সৌন্দর্য) ভালোবাসো, তারাও তাই ভালোবাসে।’ [ইমাম সাঈদ বিন মানসুর, আস-সুনান: ৭৮১; ইমাম ইবনু আবি শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ: ৪/৯৪]
.
হাদিসের দাবিও এমনই। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
.
لَا يُؤْمِنُ أحَدُكُمْ، حتَّى يُحِبَّ لأخِيهِ ما يُحِبُّ لِنَفْسِهِ
.
‘‘তোমাদের কেউ (প্রকৃত) মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ১৩]
.
আমরা অনেক সময় নিজের জন্য একরকম পছন্দ করি, আর অপরের জন্য অন্যরকম পছন্দ করি। এটি অন্যায়। এটি কোনো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
.
তাই, মেয়ের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। জোর করে কারও সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়া মানে মেয়ের উপর মারাত্মক জুলুম করা। এর জন্য অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
.
لاَ تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتّٰى تُسْتَأْمَرَ وَلاَ تُنْكَحُ الْبِكْرُ حَتّٰى تُسْتَأْذَنَ قَالُوا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَكَيْفَ إِذْنُهَا قَالَ أَنْ تَسْكُتَ.
.
‘‘কোনো বিধবা নারীকে তার সরাসরি সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেওয়া যাবে না এবং কুমারী মেয়েকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’’ লোকজন জিজ্ঞাসা করলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তার (কুমারী মেয়ের) অনুমতিটা কেমন হবে?’ তিনি বললেন, ‘‘তার চুপ থাকাটাই তার অনুমতি।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫১৩৬]
.
যদি জোর করে কোনো নারীকে বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই নারীর অধিকার থাকবে—বিচারকের রায়ের মাধ্যমে সেই বিয়ে রাখা অথবা ছিন্ন করা। এমনটিই বলেছেন আলিমগণ। এক্ষেত্রে সেই নারীর কোনো গুনাহ হবে না। এর দলিল হলো, একবার এক কুমারী মেয়ে নবিজির কাছে এসে অভিযোগ করে যে, তার বাবা তার অমতে তাকে বিয়ে দিয়েছে। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি সেই মেয়েটির হাতে ছেড়ে দেন, সে চাইলে এই বিয়ে রাখতেও পারে আবার বাতিলও করতে পারে। [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৮৭৫; হাদিসটি সহিহ]
.
-------------------------
#বন্ধন (দ্বিতীয় পর্ব)
যারা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধার্মিকতা এবং সৌন্দর্য দুটোই চান, তাদের জন্য ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা:
.
তিনি বলেন, যখন একজন পুরুষ একজন নারীকে বিয়ের (আলোচনার) প্রস্তাব দেবে, প্রথমে তার সৌন্দর্য সম্পর্কে জেনে নেবে। যদি তার সৌন্দর্যে সে সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তার ধার্মিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন করবে। যদি ধার্মিকতায়ও সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তাকে বিয়ে করবে। আর যদি সন্তুষ্ট না হতে পারে (তাহলে সে বিয়ে করবে না), এমতাবস্থায় তার বিয়ে না করাটা ধার্মিকতার (স্বল্পতার) কারণে বলে গণ্য হবে।
.
পক্ষান্তরে, মেয়ের সৌন্দর্য সম্পর্কে না জেনে প্রথমেই তার ধার্মিকতা জানার চেষ্টা করবে না। এরপর এমন যেন না হয় যে, প্রথমে তার ধার্মিকতায় সে সন্তুষ্ট হলো, এরপর যখন তার সৌন্দর্য সম্পর্কে জানলো, সে তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি, তাই প্রত্যাখ্যান করে দিলো। তাহলে, এমতাবস্থায় তার এই প্রত্যাখ্যান ধার্মিকতার জন্য হলো না, বরং সৌন্দর্যের (স্বল্পতার) জন্য হলো। [আল-ইনসাফ: ৮/১৯]
.
ইমাম আহমাদের বক্তব্যটি পড়ার পর অনেকের মনে কিছু প্রশ্ন আসতে পারে। তাদের জানার স্বার্থে বলে নেওয়া দরকার:
.
◉ হাদিসে এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি বিষয় দেখে। সেগুলো হলো: তার সম্পদ, তার বংশ, তার সৌন্দর্য ও তার ধার্মিকতা বা দ্বীনদারি। তুমি ধার্মিকতা (বেছে নেওয়া)-র মাধ্যমে সফলতা অর্জন করো।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০৯০; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৫২৭]
.
হাদিসটিতে ধার্মিকতাকে প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। তবে, অন্য তিনটি বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা হয়নি। তাই, কেউ যদি ধার্মিকতার পাশাপাশি অন্য বৈশিষ্ট্যগুলোও দেখে, তবে এটি নিন্দনীয় নয়।
.
◉ ইমাম আহমাদের মূল বক্তব্য হলো, ধার্মিকতা ও সৌন্দর্যের মাঝে সমন্বয় করতে গিয়ে যেন কোনোভাবেই ধার্মিকতাকে ছোট না করা হয়। এজন্য আগেই সৌন্দর্যের বিষয়টি ক্লিয়ার করে নেওয়া ভালো। কারণ, আপনি ধার্মিকতায় মুগ্ধ হয়ে আলোচনা এগিয়ে, পরে সৌন্দর্যের স্বল্পতার জন্য পিছিয়ে আসবেন, এটি উচিত নয়। এতে ধার্মিকতাকে ছোট করা হয়।
.
◉ কারও সৌন্দর্য কম, কিন্তু ধার্মিকতা বেশি; আবার কারও সৌন্দর্য বেশি, কিন্তু ধার্মিকতা কম। এমতাবস্থায় অধিক ধার্মিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়াই ইসলামের নির্দেশনা। তবে, এসব ব্যাপারে ইসলাম কাউকে বাধ্য করে না, কেবল নির্দেশনা দেয়। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে সৌন্দর্যহীন ধার্মিকতার মূল্য আছে, কিন্তু ধার্মিকতাহীন সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই।
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর এবং কর্মের দিকে লক্ষ করেন।’’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৬৪৩৭]
.
------------------------
#বন্ধন (তৃতীয় পর্ব)
গরিব-অসচ্ছল ছেলেকে বিয়ে না করলে কি গুনাহ হবে? বিয়ের ক্ষেত্রে একটি ছেলের কোন্ গুণগুলো অগ্রাধিকার দিতে হয়?
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবাই‘আহ বিনতে হারিস (রা.)-কে বলেছিলেন—
.
إِنْ وَجَدْتِ زَوْجًا صَالِحًا فَتَزَوَّجِي
.
‘‘যদি তুমি নেককার পুরুষ পেয়ে যাও, তবে বিয়ে করে নাও।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ২০২৮; হাদিসটি সহিহ]
.
শুধু টাকাওয়ালা, সরকারি চাকুরিজীবী বা প্রতিষ্ঠিত পাত্র খুঁজবেন না, সবার আগে দেখবেন তার দ্বীনদারি কেমন। দ্বীনদারি ঠিক থাকলে বাকিগুলোতে যথাসাধ্য ছাড় দিন। এই সময়ে প্রকৃত দ্বীনদার ছেলে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।
.
রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা যে ছেলের দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারবে, সে যদি প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার কাছে (তোমাদের মেয়েকে) বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’’ সাহাবিগণ বলেন, ‘যদি তার মাঝে কিছু ত্রুটি থাকে?’ নবিজি তখন আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করেন। [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১০৮৫; হাদিসটি হাসান সহিহ]
.
প্রশ্ন আসবে, বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলের মাল-সম্পদ এবং আর্থিক সচ্ছলতা দেখা হবে কি না?
.
এ ব্যাপারটি একান্তই অভিভাবকের ইচ্ছাধীন। তারা চাইলে গরিব কোনো দ্বীনদার ছেলের হাতে তাদের মেয়েকে তুলে দিতে পারেন, যেমনটি নবিজি করেছিলেন। তিনি আর্থিকভাবে অসচ্ছল আলি (রা.)-এর হাতে তাঁর সবচেয়ে আদরের সন্তান ফাতিমা (রা.)-কে তুলে দিয়েছিলেন। আবার কোনো অভিভাবক চাইলে দ্বীনদার সম্পদশালী ছেলের কাছেও বিয়ে দিতে পারেন, যেমনটি নবিজি করেছিলেন। তিনি সাহাবিদের মাঝে সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি উসমান (রা.)-এর কাছে নিজের মেয়ে রুকাইয়ার বিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ইন্তিকাল করলে আরেক মেয়ে উম্মু কুলসুমকেও তাঁর কাছে বিয়ে দেন।
.
ফাতিমা বিনতে কায়েস নাম্নী একজন বিদূষী নারী সাহাবিয়া ছিলেন। তাঁর স্বামী তাঁকে তালাক দিলে কয়েকজন সাহাবি তাঁর জন্য বিয়ের পয়গাম পাঠান। তখন তিনি নবিজির সাথে পরামর্শ করেন। নবিজি একজনকে এই বলে প্রত্যাখ্যান করেন যে, তিনি স্ত্রীর উপর খড়গহস্ত ছিলেন। আরেকজনকে প্রত্যাখ্যান করেন তাঁর নিঃস্ব অবস্থার জন্য। বিস্তারিত জানতে সুনানুন নাসায়ির ৩২৪৫ নং হাদিসটি দেখে নিতে পারেন। এটি বিশুদ্ধ হাদিস। তাই, বুঝা গেলো, কোনো ছেলের আর্থিক সচ্ছলতা কম থাকলে, তাকে প্রত্যাখ্যান করা জায়েয।
.
তবে, মনে রাখতে হবে, যে ছেলেকে পছন্দ করা হবে, তার মাঝে দ্বীনদারি ও সচ্চরিত্র থাকতে হবে। এটি হলো মৌলিক গুণ, যা সবসময় বিবেচনায় রাখতে হবে। দ্বীনদারি ঠিক না রেখে অন্যান্য গুণ বা অর্থ-সম্পদ দেখা ইসলামের শিক্ষা নয়।
.
-----------------------
#বন্ধন (চতুর্থ পর্ব)
পাত্র/পাত্রী আসলেই ভালো ও দ্বীনদার কি না, সেটি যাচাই করার জন্য কিছু কাজ করা যায়।
.
১) একজন ব্যক্তিকে চেনার অন্যতম উপায় হলো তার বন্ধু/বান্ধবীকে চেনা। কারণ মানুষ সে ধরনের লোককেই ফ্রেন্ড বানায়, যাকে সে ভালোবাসে এবং যার আচরণ ও চলাফেরায় সে মোটাদাগে সন্তুষ্ট।
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
.
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
.
‘‘ব্যক্তি তার বন্ধুর চালচলন অনুসরণ করে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে!’’ [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ৪৮৩৩; হাদিসটি হাসান]
.
সেজন্য পাত্র/পাত্রী কাদের সাথে ঘনিষ্ঠ, সেদিকে খেয়াল করুন। তাদের খোঁজ নিন। তাহলে ২+২=৪ মেলানো অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। তবে হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম থাকবে।
.
২) পাত্র/পাত্রীর হোস্টেল, আবাসিক হল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি জায়গাতে খোঁজ নিলে প্রকৃত অবস্থা অনেকটাই বুঝা যায়। কারণ এসব স্থানে সে চাইলেও মুখোশ পরে থাকতে পারবে না। তার প্রকৃত অবস্থা লোকজন জানবেই। বিশেষ করে রুমমেট বা ক্লাসমেটদের কাছ থেকে সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে।
.
৩) স্থানীয় মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের কাছ থেকে পাত্রের ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাওয়া যাবে। কারণ মসজিদের সাথে একটি ছেলের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
.
৪) পাত্রী চেনার ক্ষেত্রে খুব ভালো একটি উপায় হতে পারে, শাশুড়ীর দ্বীনদারি ও আচরণের ব্যাপারে ভালো করে জানা। কারণ মেয়েরা বাসায় মায়ের দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়। ধরুন, খোঁজ নিয়ে দেখলেন, মেয়ের বাবার উপর মেয়ের মা খবরদারি করে, প্রেশারে রাখে, তুচ্ছজ্ঞান করে, এমতাবস্থায় এটার সম্ভাবনা আছে যে, মেয়েটি এসব দেখে অভ্যস্ত হয়ে ভেবেই নিয়েছে—পরিবারের কর্তা (বাবা) বিশেষ কেউ না; তার নির্দেশনা বা অভিভাবকত্ব তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। তবে, অবশ্যই অনেক মেয়ে এগুলো দেখার পরও এসবে প্রভাবিত হয় না, এটাও বাস্তব সত্য।
.
৫) বাবা-মা ও পরিবারের লোকদের সাথে পাত্র/পাত্রীর আচরণ ও সম্পর্ক যাচাই করতে পারলে, সেটি দিয়েও অনেক কিছু অনুমান করা সম্ভব, ইনশাআল্লাহ। কারণ এই লোকগুলোর সাথে ব্যক্তির আসল চরিত্র প্রকাশিত হয়। তাই, এঁদের সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘সর্বোত্তম ব্যক্তি সে-ই, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৯৭৭; হাদিসটি সহিহ]
.
৬) উমর (রা.)-সহ বিভিন্ন জ্ঞানি ব্যক্তি বলেছেন, কয়েকটি সময় একজন ব্যক্তিকে প্রকৃত অর্থে চেনা যায়। সেগুলো হলো: তার সাথে দীর্ঘ ও কষ্টকর সফরে করলে, তার সাথে লেনদেন করলে, তার সাথে রাগারাগি হলে এবং তার প্রতিবেশী হলে। এবার খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন—পাত্র-পাত্রীর সাথে এ ধরনের অভিজ্ঞতা যাদের সাথে আছে, তাদের মন্তব্য কী!
.
৭) তাছাড়া কনে দেখার সময় সামনাসামনি বর এবং কনে একে অপরকে কিছু প্রশ্ন করতে পারে। এগুলোর উত্তরের মাধ্যমেও ব্যক্তির ব্যাপারে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে পারে: জীবনের উদ্দেশ্য কী, বিয়ে কেন করতে চায়, মাহরাম এবং নন-মাহরাম মেন্টেইন করে চলে কি না, সপ্তাহে কয় দিন কুরআন পড়ে, প্রতিদিন বারো রাকাত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আদায় করে কি না, (কনের ক্ষেত্রে) স্বামীর আনুগত্যের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বামীর আনুগত্যের সর্বোচ্চ সীমারেখা জানে কি না ইত্যাদি।
.
তবে, অনেক মানুষ এ সময় নার্ভাস ফিল করে আর অনেকে স্বভাবসুলভ বাকপটুতা দেখাতে পারে। তাই, এ বিষয়টা মাথায় রাখা জরুরি।
.
আরও কোনো উপায় থাকলে আপনারা কমেন্টে শেয়ার বরতে পারেন। অন্যরা উপকৃত হবে, ইনশাআল্লাহ।
.
----------------------
#বন্ধন (পঞ্চম পর্ব)
কেমন মেয়ে বিয়ে করবেন? এ ব্যাপারে ইসলাম সরাসরি যেসব নির্দেশনা প্রদান করে:
.
১) দ্বীনদার অর্থাৎ, ধার্মিক মেয়ে।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি বিষয় দেখে। সেগুলো হলো: তার সম্পদ, তার বংশ, তার সৌন্দর্য ও তার ধার্মিকতা বা দ্বীনদারি। তুমি ধার্মিকতা (বেছে নেওয়া)-র মাধ্যমে সফলতা অর্জন করো।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০৯০; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৫২৭]
.
২) প্রেমময়ী ও অধিক সন্তান-প্রসবা মেয়ে।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা প্রেমময়ী অধিক সন্তান-প্রসবা নারীকে বিয়ে করো। কেননা, আমি অন্যান্য (নবিগণের) উম্মতের সাথে তোমাদের দ্বারা সংখ্যাধিক্যের গর্ব করবো।’’ [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ২০৫০; ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ১৩৫৯৪; হাদিসটি হাসান সহিহ]
.
প্রশ্ন আসবে, বিয়ের আগে কীভাবে বুঝবো যে, মেয়েটি প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান-প্রসবা?
.
এর উত্তরে হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, দুইভাবে এটি জানা যেতে পারে। যদি মেয়েটি বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা হয়ে থাকে, তাহলে সহজেই জানা যাবে, তার আগের দাম্পত্যজীবনের ব্যাপারে খোঁজ নিলে। আর যদি কুমারী (অবিবাহিত) হয়, তাহলে সেই মেয়ের নিকটাত্মীয় নারীদের মাধ্যমে অনুমান করবে। যেমন: তার মা, বোন এবং খালা। তাদের মধ্যে যদি এই দুটো গুণ থাকে, তাহলে এই মেয়ের মাঝেও এসব গুণ থাকার সম্ভাবনা থাকবে। মোটকথা, এটি মোটাদাগে অনুমান করা। হুবহু তো মিলবেও না।
.
৩) কুমারী মেয়ে।
.
নবিজি তাঁর সাহাবিগণের সাথে খুব খোলাখুলি কথা বলতেন। কারণ তিনি তাঁদের অত্যন্ত আপনজন ছিলেন।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা কুমারী বিয়ে করবে। কেননা তাদের মুখ মিষ্ট (কামনাপূর্ণ অথবা বাক্যালাপে সুমিষ্ট), তাদের গর্ভ (সন্তানধারণে) অধিক অনুকূল এবং তারা অল্পতেই পরিতুষ্ট থাকে।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৮৬১; হাদিসটি হাসান]
.
অন্য বর্ণনায় এসেছে, সাহাবি জাবির (রা.) একজন বিধবাকে বিয়ে করেন। তখন নবিজি বলেছিলেন, তুমি যদি কুমারী বিয়ে করতে, তাহলে তার সাথে খেল-তামাশা করতে পারতে আর সেও তোমার সাথে আনন্দ করতে পারতো। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০৭৯]
.
তখন জাবির (রা.) বলেন, আমি এমন একজনকে বিয়ে করতে চেয়েছি, যে হবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, কারণ আমার বাসায় কয়েকজন বোন আছে। তখন নবিজি বলেন, তাহলে ঠিক আছে। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ২৩০৯]
.
কুমারী বিয়ে করতে বলা হয়েছে মানে এই না যে, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা নারী বিয়ে করা যাবে না। বরং সাহাবিগণের সময়ে অনেক বিধবা এবং তালাকপ্রাপ্তা নারীকে বিয়ে করার জন্য পুরুষ সাহাবিগণ প্রতিযোগিতা শুরু করে দিতেন। বন্ধন সিরিজের তৃতীয় পর্বের শেষে এমন একজনের ঘটনা আছে। এমনকি একমাত্র আয়িশা (রা.) বাদে নবিজির সকল স্ত্রীই ছিলেন বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা। খোদ নবিজি নিজেই অনেক বিধবা নারীকে বিভিন্ন সাহাবির সাথে বিয়ে দিয়েছেন।
.
আলিমগণ বলেন, সাধারণত কুমারী নারীরা অধিক লাজুক, সরল ও ভালোবাসাপ্রবণ হয়। তাদের জীবনে পূর্বে কোনো পুরুষ না আসায় স্বামীর ব্যাপারে আবেগ-উচ্ছ্বাস বেশি থাকে। পুরুষরা লাজুক ও সহজ-সরল মেয়েদের অধিক পছন্দ করে। যদিও বর্তমান বাস্তবতা বেশ নিদারুণ। পুরুষের সঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা কুমারী নারী এখন আগের মতো নেই। আবার নারীসঙ্গ থেকে দূরে থাকা অবিবাহিত পুরুষও কমে গেছে। ভাইস ভার্সা। তাই, নবিজি যে সেন্স থেকে এই প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সেটি বর্তমানে কমই প্রতিফলিত হয়।
.
বিধবা নারী অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিধায় বিয়ের ক্ষেত্রে তার সরাসরি মতামত ব্যতীত তাকে বিয়ে দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে কুমারী মেয়ে শুধু রাজি থাকলেই যথেষ্ট। এমনকি সে চুপ থাকলে ধরে নেওয়া হবে, সে রাজি। কিন্তু বিধবার ক্ষেত্রে সরাসরি স্পষ্ট অনুমতি লাগবে। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৬৯৬৮]
.
সবকিছুর পর মূল যে কথা আসবে সেটি হলো, সর্বপ্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে দ্বীনদারি। প্রেমময়ী হওয়া বা কুমারী হওয়া এগুলো পরের ব্যাপার। এগুলো বাধ্যতামূলক কিছু নয়। আমরা কেউ যেন এমনটি না ভাবি যে, ইসলাম সম্ভবত বিধবাদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা দিয়েছে। বরং হাদিসে এসেছে, যে বিধবাকে সাহায্যের জন্য লেগে থাকে, সে ওই ব্যক্তির মতো, যে রাতভর নামাজ পড়ে অথবা একটানা রোজা রেখে যায়। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫৩৫৩]
.
আরেকটি বিষয় হলো: বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা মানেই লাজুকতাহীন, সরলতাহীন বা কম ভালোবাসাপ্রবণ, সেটি বাস্তব নয়। আবার সব কুমারীই যে লাজুক, সরল বা প্রেমময়ী হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমনই, নবিজি যেমনটি বলেছেন।
.
-------------------------
#বন্ধন (ষষ্ঠ পর্ব)
বর-কনের মধ্যে কারও যদি ‘খারাপ অতীত’ থাকে, তাহলে সেটি বলতে সে কি বাধ্য? কিংবা বিয়ের পর এটি জেনে গেলে কী করণীয়?
.
(১) প্রথম কথা হলো, কখনও মানুষের কাছে তার গোনাহের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে নেই। এটা অভদ্রতা এবং ইসলামি ম্যানার ও শালিনতার লঙ্ঘন। সুতরাং কেউ তার হবু বর/কনেকে এ ধরনের প্রশ্ন করে বিব্রত করবে না। এমনকি, কোনো মানুষকেই না।
.
আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজিদে বলেন—
.
لَا یُحِبُّ اللّٰهُ الۡجَهۡرَ بِالسُّوۡٓءِ مِنَ الۡقَوۡلِ اِلَّا مَنۡ ظُلِمَ
.
‘‘মন্দ কথার প্রকাশ আল্লাহ পছন্দ করেন না, কেবল যার উপর জুলুম করা হয়েছে (তার ব্যাপারটি ভিন্ন)।’’ [সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৮]
.
(২) গুনাহের কথা মানুষকে বলা নিষেধ। সুতরাং, ভালোমানুষী দেখিয়ে বিয়ের আগে নিজের খারাপ অতীত বলতে যাবেন না।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আমার সকল উম্মাতকে মাফ করা হবে, তবে মুজাহিররা (গুনাহ প্রকাশকারী) ব্যতীত। আর নিশ্চয় এটি খুবই অন্যায় যে, কোনো লোক রাতের বেলা (গোপনে গোনাহের) কাজ করলো। এরপর সে সকাল করলো এমতাবস্থায় যে, আল্লাহ সেটি ঢেকে রাখলেন। কিন্তু সে বলে বেড়াতে লাগলো, ‘হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটিয়েছিলো যে, আল্লাহ তার কাজটি ঢেকে রেখেছিলেন, আর সে সকালে তার উপর আল্লাহর দেওয়া আবরণ খুলে ফেললো। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৬০৬৯]
.
(৩) বিয়ের আগে যদি হবু বর অথবা কনে অতীতের ব্যাপারে প্রশ্ন করে, তবে কি তাকে সেটি বলতে হবে? এর উত্তরে স্বনামধন্য দুটো ফাতাওয়া অথরিটি islamqa(.)info এবং islamqa(.)org (দারুল ইফতা বার্মিংহাম) থেকে বলা হয়েছে, এই প্রশ্নের উত্তরে তাকে অতীতের কথা জানানো বাধ্যতামূলক নয়, যদি সে সেই গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করে থাকে।
.
(৪) বিয়ের পর যদি স্বামী/স্ত্রী এ ধরনের প্রশ্ন করে, তাহলেও সেটি স্বীকার করার বাধ্য-বাধকতা নেই, যদি সেই গুনাহ থেকে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করা হয়ে থাকে। বরং এক্ষেত্রে জরুরি হলো, তাকে মিথ্যা বলা যে, কোনো খারাপ অতীত ছিলো না। এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ হাদিস আছে যে, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সন্তুষ্ট করতে মিথ্যা বলতে পারবে। [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১৯৩৯; ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৬৫২৭]
.
এই মিথ্যার সুযোগ নিয়ে অন্যায় করা, জুলুম করা বা বিশ্বাসঘাতকতা করা জায়েয হবে না। এই মিথ্যার ধরন নিয়ে অন্য পোস্টে ডিটেইলস আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
.
(৫) বিয়ের আগে যদি বর অথবা কনে জেনেই যায় যে, তার হবু বর/কনের একটা অতীত আছে, তাহলে তার কী করণীয়?
.
সহজ উত্তর হলো, এই বিষয়টি একান্তই তার ইচ্ছার সাথে সম্পর্কিত। যদি তার হবু বর/কনে ইতোমধ্যে তাওবাহ করে থাকে, তাহলে সে বিয়ের দিকে আগাতে পারে। আবার তার রুচি না হলে বাদও দিতে পারে।
.
বিশেষ করে, যে ছেলে/মেয়ের অতীত রিলেশন থাকে, সে সম্পর্কের ব্যাপারে অনেক বেশি এক্সপেরিয়েন্সড হয়। ফলে তার আচরণে একটা গাম্ভীর্য থাকে, সতর্কতা থাকে, মার্জিন থাকে। অন্যদিকে, যে এসবে কখনও জড়ায়নি, তার মধ্যে থাকে সরলতা, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং উচ্ছ্বাস। সুতরাং এই দুটোর মাঝে মনঃস্তাত্ত্বিক কোনো দ্বন্দ্ব হলে হতেও পারে।
.
তবে, এসব তত্ত্বকথা সবক্ষেত্রে সমান হয় না। বরং উল্টোটাও হয় অনেকের ক্ষেত্রে। আমাদের মূল কনসার্ন হওয়া উচিত—একজন ব্যক্তির বর্তমান অবস্থা কী—সে বিষয়ে সঠিকভাবে অবগত হওয়া। বিশেষ করে, কেউ যদি তাওবাহ করে, তাহলে তার অতীত টেনে তাকে কষ্ট দেওয়া জায়েয নেই। হাদিসে এসেছে, ‘‘অনুতপ্ত হওয়াই (প্রকৃত) তাওবাহ। গুনাহ থেকে তাওবাহকারী সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহই নেই।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ৪২৫০ ও ৪০৫২; শায়খ আলবানি, সহিহুল জামি’: ৬৮০৩; হাদিসটি হাসান]
.
(৬) বর্তমান জামানায় এত ফিতনার মাঝেও যে নিজেকে অনেক কষ্টে পবিত্র রেখেছে, সে তো তার মতো কাউকে চাইতেই পারে। এটাতে অন্যায়ের কিছু নেই। একদিকে কারও ‘খারাপ অতীত’ জানতে চাওয়ার সুযোগ নেই, অন্যদিকে নিজের মতো পরিচ্ছন্ন অতীতের কাউকে পাওয়ার তীব্র বাসনা—এর সমাধান কী?
.
উত্তরে বলবো: তাওবাহ করে, অনুশোচিত হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার পরও যদি কারও ‘খারাপ অতীত’ আপনি মানতে না পারেন, তাহলে তার সাথে বিয়ের কথা বলার সময় সরাসরি বলে দিন এটা, যাতে সে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাহলে হয়তো সে যেকোনো কারণ দেখিয়ে বিয়ের আলোচনা থামিয়ে দিতে পারে (নিজের খারাপ অতীত শেয়ার করবে না; করা উচিতও না, বরং অন্য কোনো কারণ দেখাবে)। মূলকথা, বিয়ের আলোচনার সময়ই এসব বিষয় শেষ করে ফেলতে হবে। বিয়ের পর যদি এসব নিয়ে ওঠতে-বসতে কথা শোনান, খোঁটা দেন, তাহলে সেটি হবে চরম অভদ্রতা আর ছোটলোকী।
.
আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফিক দিন।
.
------------------------
#বন্ধন (সপ্তম পর্ব)
বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর যে বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়, তার মধ্যে ‘কুফু’ অন্যতম। এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নিন।
.
আরবি ‘কুফু’ শব্দের অর্থ সমতা, সাদৃশ্য, সমকক্ষতা ইত্যাদি। বিয়েতে বর-কনের মাঝে সমতাবিধানকে আরবিতে ‘কুফু’ বলা হয়। স্বামী-স্ত্রীর বিবাহিত জীবনের দীর্ঘ পথচলা যেন সুখের হয় এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো হয়, সেজন্য কুফু গুরুত্বপূর্ণ।
.
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্য (জীবনসঙ্গী) বাছাই করো, সমতা (কুফু) বিবেচনায় বিবাহ করো এবং বিবাহ দিতেও সমতার প্রতি লক্ষ্য রাখো।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৯৬৮; হাদিসটি হাসান]
.
কথা হলো: কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে কুফু বিবেচনা করতে হবে? আলিমগণের একটি অংশ চারটি বিষয়কে কুফুর অন্তর্ভূক্ত বলেছেন। সেগুলো হলো: দ্বীনদারি, স্বাধীন হওয়া (ক্রীতদাস না হওয়া), বংশমর্যাদা এবং পেশা।
.
তাঁদের মতে, অতি উচ্চ বংশের কারও সাথে একদম নিচু বংশের কারও বিবাহ না দেওয়া উচিত। এমনকি সাহাবিগণের মাঝেও এসব কারণে অমিল হয়েছে (তবে, সেটি কিছু সাহাবির ক্ষেত্রে হয়েছে)। যেমন: নবিজির মুক্ত দাস যায়েদ (রা.)-এর সাথে কুরাইশ বংশের রমণী যাইনাব (রা.)-এর বিবাহ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ তাঁদের রুচি ভিন্ন ভিন্ন ছিলো।
.
ইমাম মালিক (রাহ.)-সহ অনেক আলিম কেবল দ্বীনদারির ক্ষেত্রে বর-কনের মাঝে সমতাবিধানকে জরুরি বলেছেন। এই মতটিই সবচেয়ে উত্তম।
.
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘দুশ্চরিত্রা নারীরা দুশ্চরিত্র পুরুষদের জন্য এবং দুশ্চরিত্র পুরুষরা দুশ্চরিত্রা নারীদের জন্য। নেককার নারীরা নেককার পুরুষদের জন্য এবং নেককার পুরুষরা নেককার নারীদের জন্য।’’ [সুরা নুর, আয়াত: ২৬]
.
সেরা তিনজন ধনী সাহাবির একজন কুরাইশ বংশের আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর বোনকে নবিজি বিয়ে দেন দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া বিলাল (রা.)-এর সাথে। এমন অসম বিবাহের ঘটনা সাহাবিগণের মাঝে অনেক ছিলো।
.
মূল বিষয় হলো: দ্বীনদারি ঠিক থাকলে অন্য কিছু সেভাবে ম্যাটার করে না। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটে। সেজন্য নবিজি দ্বীনদারিকে গুরুত্ব দিয়েছেন।
.
রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তোমরা যে ছেলের দ্বীনদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পারবে, সে যদি প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার কাছে (তোমাদের মেয়েকে) বিয়ে দিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’’ সাহাবিগণ বলেন, ‘যদি তার মাঝে কিছু ত্রুটি থাকে?’ নবিজি তখন আগের কথারই পুনরাবৃত্তি করেন। [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১০৮৫; হাদিসটি হাসান সহিহ]
.
বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘‘মনে রেখো! আরবের ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং অনারবের ওপরও কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করা যায় কেবল তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীতির মাধ্যমে।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৩৪৮৯; হাদিসটি সহিহ]
.
উপসংহার:
কুফুর বিষয়টি দ্বীনদারির ক্ষেত্রে খুবই জরুরি। কারণ একজন পাপাচারী ব্যক্তির সাথে একজন দ্বীনদার ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য অনিবার্য। আর, দ্বীনদারি ঠিক থাকলে বংশমর্যাদা বা অন্য বিষয়গুলো মানিয়ে নেওয়া যায়। তবুও বংশমর্যাদার বিষয়টি ফেলনা নয়। বিশেষত, বর্তমান সময়ে তো প্রকৃত দ্বীনদার পাওয়াই কঠিন। সেজন্য দুটো পরিবারের মাঝে উত্তম বন্ধন কায়েম রাখার স্বার্থে বংশমর্যাদা এবং অন্যান্য দিকে কিছুটা হলেও নজর দেওয়া ভালো। তবে, অবশ্যই অবশ্যই দ্বীনদারিকে সবার আগে রাখতে হবে। তবে, জেনে রাখবেন, কুফু জিনিসটা বিয়ে হওয়া বা না হওয়ার মতো কিছু নয়। এটি উচিত-অনুচিত ও উত্তম-অনুত্তমের ব্যাপার মাত্র। কুফু না মেনে বিয়ে করলেও বিয়ে হয়ে যাবে।
.
--------------------------
#বন্ধন (অষ্টম পর্ব)
বিয়ের জন্য একজন মেয়েকে কতটুকু দেখা যাবে? লুকিয়ে দেখা যাবে? কনে দেখার ভুল:
.
প্রথম কথা হলো, বিয়ের উদ্দেশ্যে কনে দেখা মুস্তাহাব (উত্তম)। এক ব্যক্তি নবিজির নিকট এসে তাঁকে বলেন যে, তিনি আনসার সম্প্রদায়ের এক মেয়েকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, ‘‘তুমি কি তাকে দেখেছো?’’ তিনি বলেন, ‘না।’ তখন নবিজি বললেন, ‘‘যাও! তুমি তাকে (আগে) দেখে নাও।’’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৩৭৬]
.
❂ কনেকে আগে দেখে নেওয়ার উপকারিতা:
.
মুগিরা ইবনু শু’বা বলেন, রাসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় আমি এক নারীকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলাম। তখন নবিজি বলেন, ‘‘তুমি তাকে দেখে নাও। কেননা, এতে তোমাদের মধ্যে ভালবাসা (আগ্রহ) তৈরি হবে।’’ [ইমাম নাসায়ি, আস-সুনান: ৩২৩৫; হাদিসটি সহিহ]
.
❂ বিয়ের উদ্দেশ্য ঠিক থাকলে কনেকে আড়ালে লুকিয়ে থেকেও দেখা যাবে:
.
জাবির (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের কেউ যখন কোন নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেবে, সম্ভব হলে সে তার এমন কিছু দেখে নেবে, যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে।’’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা গোপন রেখেছিলাম। অতঃপর আমি তার মাঝে এমন কিছু দেখি, যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আকৃষ্ট করে। অতঃপর আমি তাকে বিয়ে করি।’ [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ২০৮২; হাদিসটি হাসান]
.
মুহাম্মাদ বিন সালামাহ (রা.) বলেন, আমি এক নারীকে বিবাহের প্রস্তাব পাঠালাম। আমি তাকে দেখার জন্যে চুপিসারে তার বাগানে যাতায়াত করতাম এবং সেখানে (একদিন) তাকে দেখে ফেললাম। তাকে বলা হলো, ‘রাসুলের সাহাবি হয়ে আপনি এই কাজ করলেন?’ তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘‘যখন আল্লাহ কারো অন্তরে কোন নারীকে বিবাহ করার প্রস্তাব দানের আগ্রহ সৃষ্টি করেন, তখন তাকে দেখে নেওয়াতে দোষের কিছু নেই।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৮৬৪; হাদিসটি সহিহ]
.
অন্য বর্ণনায় এটাও এসেছে যে, তার (মেয়ের) অজান্তেও যদি তাকে দেখা হয়, তাহলে গোনাহ হবে না। [ইমাম তহাবি, শারহু মা‘আনিল আসার: ২৪২৭; হাদিসের সনদ সহিহ]
.
❂ কনেকে কতটুকু দেখা যাবে? আর হবু বরকে কনে কতটুকু দেখতে পারবে?
.
হবু বরের নাভী থেকে হাঁটু, অর্থাৎ সতরের অংশটুকু বাদে বাকি সবকিছুই কনে দেখতে পারবে। এ ব্যাপারে আলিমগণ একমত।
.
কনের চেহারা এবং কব্জি পর্যন্ত হাত দেখার ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত। ইমাম নববি (রাহ.) বলেন, চেহারা দেখার দ্বারা মেয়ের সৌন্দর্য বুঝা যায় আর কব্জি পর্যন্ত হাত দেখার দ্বারা মেয়ের শারীরিক গঠন (স্লিম-হ্যালদি ইত্যাদি) বুঝা যায়।
.
তবে, ইমাম আবু হানিফা (রা.)-এর মতে, এগুলোর পাশাপাশি তার গোড়ালি থেকে পায়ের নিচের অংশও দেখা যাবে।
.
এ ব্যাপারে হাম্বলি মাযহাবের আলিমগণের মু’তামাদ মত হলো: একজন মেয়ে ঘরোয়া পরিবেশে পরিবারের সদস্যদের সামনে যে অবস্থায় থাকে, সে অবস্থায় দেখা যাবে। যেমন: তার হাত (কনুই পর্যন্ত), চেহারা, ঘাড়, পা ইত্যাদি।
.
তবে, আলিমগণ বলেছেন, তার দিকে কামনার দৃষ্টিতে তাকাবে না। বরং স্বাভাবিক দৃষ্টি দেবে। আর, যেহেতু এটা বিবাহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য, সেহেতু বারবার তাকালেও কোনো গোনাহ হবে না।
.
❂ কনে দেখতে গিয়ে যে ভুলগুলো হয়:
.
কোনোভাবেই কনেকে বরপক্ষের কোনো পুরুষ দেখতে পারবে না। এমনকি বরের বাবাও নয়। শুধু বর দেখবে। বিয়ের কনে দেখার সব হাদিসে নির্দিষ্টভাবে শুধু বরের কথাই এসেছে। তবে, বরের নারী আত্মীয়রা ইচ্ছামত দেখতে পারবে। এতে কোনো বাধা-নিষেধ সেই।
.
কোনোভাবেই বিয়ের আগে বর-কনে নিরবে একত্র হতে পারবে না। যতই কথা বলার প্রয়োজন হোক, অবশ্যই সেই মেয়ের কোনো মাহরাম পুরুষ সামনে থাকতে হবে। অথবা, অন্তত মাহরামের চোখের সামনে, সামান্য দূরে, স্বল্প সময়ে বিশেষ কথা হতে পারে, যদি কিছু বলার বা জানার থাকে। কারণ হাদিসে বলা হয়েছে, ‘‘মাহরাম পুরুষ ব্যতীত কোনো নারীর সাথে যেন কোনো পুরুষ নিরিবিলিতে একত্র না হয়।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫২৩৩]
.
অন্য হাদিসে এসেছে, ‘‘যখন কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নিরবে একত্র হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’’ [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১১৭২; হাদিসটি সহিহ]
.
আর, অবশ্যই এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ফিয়ান্সের (হবু বর-বউ) সাথে বিয়ের আগে ঘোরাঘুরি করা যাবে না। হাদিসে এসেছে, ‘‘কোনো নারী যেন তার মাহরাম ব্যতীত সফর না করে।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ১৮৬২]
.
কনের ছবি দেওয়া যাবে না। তবে, কনেপক্ষের কোনো মাহরাম পুরুষ তার নিজের মোবাইলে পাত্রকে কনের ছবি দেখাতে পারে। কিন্তু ছবি তাকে পাঠাবে না।
.
-----------------------
#বন্ধন (নবম পর্ব)
বিয়ে করার জন্য একটি ছেলের শারীরিক ও আর্থিক ‘সামর্থ্য’ ন্যূনতম কতটুকু হওয়া জরুরি? বিষয়টি কি আসলেই এত কঠিন ও জটিল?
.
প্রথমে আসি শারীরিক সামর্থ্যের ব্যাপারে। ইসলামি শরিয়াহ মতে, যখন থেকে একটি ছেলের ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হয়, তখন থেকেই সে বালেগ হয়ে যায়; বাংলায় যাকে আমরা প্রাপ্তবয়স্ক (adult) বলি। তখন থেকেই তার উপর শরিয়তের প্রতিটি বিধান মানা ফরজ হয়ে যায় এবং সে বিয়ের ব্যাপারে উপযুক্ত সাব্যস্ত হয়। যদি বালেগ হওয়ার পর কোনো ছেলের মাঝে যৌন সমস্যা দেখা দেয়, অথবা নারীদের প্রতি আগ্রহবোধ না করে কিংবা পুরুষত্বহীনতার সম্ভাবনা থাকে, তখন তার জন্য বিয়ে করা জায়েয নেই। বরং সে চিকিৎসা নেবে, সুস্থ হবে, এরপর বিয়ের চিন্তা করবে। আর, যদি সে অন্য দশটি ছেলের মতো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করে, নারীদের প্রতি যৌন কামনা অনুভব করে এবং সঙ্গীর অভাববোধ করে, তাহলে তাকে বিয়ের ব্যাপারে ‘শারীরিকভাবে সক্ষম’ হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। অর্থাৎ, যৌন অক্ষমতার ব্যাপারটি ব্যতিক্রমী কেইস। একমাত্র যে রোগী, সে ব্যতীত অন্যদেরকে শারীরিকভাবে সক্ষম হিসেবে ধরে নেওয়া হবে। কারণ বিয়ের আগে হারাম পন্থায় যৌনতা করে নিজেকে প্রমাণ করার কথা ইসলাম বলে না। ছেলে যদি সহবাসের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকে, তাহলেই যথেষ্ট।
.
এরপর আসি, আর্থিক সামর্থ্যের ব্যাপারে।
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘হে যুবকের দল! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয় এবং যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা, রোজা যৌন কামনাকে দমন করে।’’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০৬৫]
.
অর্থাৎ, কোনো ছেলে যদি বউয়ের ভরণপোষণ দেওয়ার ব্যাপারে সামর্থ্য না রাখে, তাহলে আপাতত সে অপেক্ষা করবে। ভরণপোষণ বলতে, কমপক্ষে বউয়ের খাবার, কাপড় এবং বাসস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
.
তবে, এ ব্যাপারে সহজ কথা হলো: কোনো ছেলে যদি আর্থিকভাবে খুব দুর্বলও হয়, কিন্তু পরিশ্রমী ও উদ্যমী হয়, হালাল উপার্জনের ব্যাপারে অলসতা না করে এবং পরিবারের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়, তাহলে সেই ছেলের বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই। যেমন: আলি (রা.)-এর কাছে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সবচেয়ে আদরের কন্যা ফাতিমা (রা.)-কে বিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ আলি (রা.) তখন অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন। সহিহ বুখারিতে (৫১৩৫ নং হাদিস) এসেছে, একজন দরিদ্র সাহাবির সাথে নবিজি এক নারীকে বিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সাহাবির কিছুই ছিলো না। ফলে, বউকে কুরআন শেখানোর শর্তে (অর্থাৎ এটিকে মোহরানা বানিয়ে) বিয়ে দেন। নবিজি তার আর্থিক দুরবস্থার কারণে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোমার কাছে কি একটা লোহার আংটিও নেই?’ তখন সেটিও ছিলো না সেই সাহাবির কাছে।
.
সহজ কথা হলো: বর্তমানে যেমন আমাদের অনেকের একটা ফিক্সড ইনকামের ব্যবস্থা থাকে, সাহাবিদের মধ্যে তেমনটা ছিলো না। তাঁদের অনেকেই দিন এনে দিন খেতেন। তাই, উপস্থিত সময়ে যদি সেরকম অর্থ-সম্পদ না থাকে, কিন্তু সে হালাল উপার্জনে অভ্যস্ত থাকে আর কনে তার এই অবস্থাটি মেনে নেয়, তাহলে তার বিয়ে করতে কোনো বাধা নেই, যদিও সে অত্যন্ত দরিদ্র হয়।
.
আর্থিক সামর্থ্যের ব্যাপারে অসাধারণ আলোচনা পাবেন শায়খ মুহাম্মাদ সলিহ আল মুনাজ্জিদ পরিচালিত Islamqa থেকে। লিংক: https://islamqa.info/en/answers/181556/the-hadeeth-whoever-among-you-can-afford-it-let-him-get-married-does-not-mean-that-one-who-is-poor-cannot-get-married?fbclid=IwAR030fP_dAUFHkIMTbLEAgSVubN2KUOBbDuxl41108d-zlzCYDxODl9cyPk
.
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎ, তাদেরকেও। তারা অভাবগ্ৰস্ত হলে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করবেন; আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’’ [সুরা নুর, আয়াত: ৩২]
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা তিন শ্রেণির মানুষকে সাহায্য করা নিজের কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। (১) আল্লাহর পথে জিহাদকারী; (২) চুক্তিবদ্ধ গোলাম, যে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা করে এবং (৩) বিবাহে আগ্রহী ব্যক্তি, যে (বিয়ের মাধ্যমে) পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়।’’ [ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১৬৫৫; হাদিসটি হাসান]
.
------------------------
#বন্ধন (দশম পর্ব)
বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করুন, তাহলে মনোবল দৃঢ় থাকবে ইনশাআল্লাহ
.
নবিজির আপন চাচাতো বোন ছিলেন যাইনাব বিনতে জাহাশ (রা.)। নবিজি প্রথমে তাঁকে বিয়ে দেন যায়েদ বিন হারিসা (রা.)-এর সাথে। কিন্তু তাঁদের মাঝে বনিবনা হয়নি, তাই তালাক হয়ে যায়। এরপর নবিজি নিজে তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তখন যাইনাব (রা.) ইস্তিখারা করার জন্য সময় চেয়ে নেন এবং তৎক্ষণাৎ নামাজে দাঁড়িয়ে যান। [ইমাম নাসায়ি, আস-সুনান: ৩২৫১; হাদিসটি সহিহ]
.
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম, বিয়ের ক্ষেত্রে ইস্তিখারা করার ব্যাপারে বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে। জাবির ইবনু আবদিল্লাহ (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে প্রতিটি কাজে (সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে) ইস্তিখারা করতে শেখাতেন, যেভাবে তিনি আমাদের কুরআনের সুরা শেখাতেন।’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ১১৬২]
.
প্রশ্ন আসবে, ইস্তিখারা কী?
.
সহজ কথায়: ইস্তিখারা মানে কল্যাণ কামনা করা, সঠিক দিক-নির্দেশনা কামনা করা। অর্থাৎ, কোনো কাজের কল্যাণ কামনায় দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে হাদিসে বর্ণিত দু‘আটি পড়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা।
.
ইস্তিখারা করতে হয় দুটো ক্ষেত্রে:
.
(১) কোনো কাজ করতে যাচ্ছেন, কিন্তু সেটি আপনার জন্য কতটুকু ঠিক-বেঠিক তা জানেন না, তখন সেই কাজটিতে যাতে আল্লাহ কল্যাণ দেন, সেজন্য ইস্তিখারা করা। আর, যদি তাতে আপনার জন্য কল্যাণ না থাকে, তাহলে যেন তিনি এটি থেকে আপনাকে দূরে রাখেন।
.
(২) দুটো একই ধরনের কাজ সামনে উপস্থিত। আপনি বুঝতে পারছেন না, কোন্ কাজটি গ্রহণ করবেন আর কোনটি বাদ দেবেন। তখন আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করবেন, আপনার জন্য যেটি উত্তম ও বেটার, সেটিই যেন করার তাওফিক দেন। ধরুন, একসাথে দুটো জবের অফার এসেছে, দুটো বিয়ের প্রস্তাব এসেছে, দুটো ট্যুরের সুযোগ এসেছে, তখন কোনটি গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে কনফিউশানে পড়ে গেছেন। তখন ইস্তিখারা করবেন।
.
ইস্তিখারা করলে মানসিক তৃপ্তি পাওয়া যায়, মনোবল চাঙ্গা হয়, ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ হয়ে যায়। তাই, বিয়ের ক্ষেত্রে ইস্তিখারা করে নিতে ভুল করবেন না। ইস্তিখারার মাধ্যমে দু‘আ করে আল্লাহকে বলবেন, ‘হে আল্লাহ! এই পাত্র/পাত্রীর মাঝে যদি আমার জন্য কল্যাণ থাকে, তাহলে তাকে আমার জন্য কবুল করুন। না হয়, যে পাত্রের/পাত্রীর মাঝে আমার কল্যাণ আছে, তাকে ব্যবস্থা করে দিন।’ (এটা একটা স্যাম্পল, আপনারা আরও সুন্দর ভাষায় বলবেন)
.
নিয়ম হলো: প্রথমে নিজের আকল-বুদ্ধি দিয়ে বিষয়টি আগে বিবেচনা করা, এরপর যোগ্য ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করা, সর্বশেষ ইস্তিখারা করে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা।
.
ইস্তিখারার নিয়ম হলো: প্রথমে ইস্তিখারার উদ্দেশ্যে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়বেন। নিয়ত মনের ইচ্ছার ব্যাপার, মুখ ফুটে কিছু বলতে হবে না। এরপর সাধারণ নফলের মতোই দুই রাকাত নফল পড়বেন। অতঃপর সিজদায় কিংবা সালাম ফেরানোর আগে কিংবা নামাজ শেষে ইস্তিখারার দু‘আটি পড়বেন। তিন স্থানের যেকোনো স্থানেই পড়তে পারেন।
.
ইস্তিখারার দু‘আটি বেশ বড়। সেজন্য আমরা এটি আলাদা আলাদা বাক্যে অর্থ, বাংলা উচ্চারণ এবং অডিওসহ উপস্থাপন করেছি। কমেন্টে লিংক পাবেন। শিখে নিতে পারেন।
.
ইস্তিখারার দু‘আর মধ্যে ‘হাযাল আমরা’ (এর অর্থ: এই কাজটি)-এর স্থানে পড়তে পারেন ‘হাযাল ফুলান’ (এই পুরুষ, অর্থাৎ যার সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে) অথবা ‘হাযিহিল ফুলানাহ’ (এই নারী, অর্থাৎ যার সাথে বিয়ের ব্যাপারে কথা হচ্ছে)। কিংবা বলতে পারেন, ‘হাযিহিস সিলাহ’ (এই বন্ধন, অর্থাৎ বিয়ে)।
.
>> ইস্তিখারা সিরিজ
https://justpaste.it/2i736
.
------------------------------
#বন্ধন (একাদশ পর্ব)
জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতে গিয়ে আমরা অনেকেই একটি বড় ভুল করি। সেটি হলো, কারো বাহ্যিক দ্বীনদারি/ভালোমানুষী দেখে তার ব্যাপারে প্রচণ্ড মুগ্ধ হয়ে যাওয়া। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা:
.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন—
.
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
.
‘‘তোমাদের কাছে হয়তো কোনো একটি বিষয় পছন্দনীয় নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তো কোনো একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয়, অথচ তোমাদের জন্য তা অকল্যাণকর। বস্তুত আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।’’ [সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬]
.
এক.
যে ছেলেকে বাহ্যিকভাবে দেখে আপনি দুর্বল হয়ে গেছেন, তার অভ্যন্তরীণ দ্বীনদারির অবস্থা তেমন ভালো না-ও হতে পারে। হতে পারে, সে নামাজের ব্যাপারে উদাসীন। বিশেষত ফরজের বাইরে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা নামাজের ব্যাপারে তার মধ্যে হয়তো তেমন সিরিয়াসনেস নেই। হতে পারে, সে দৃষ্টির হেফাজত করে না, গাইরে মাহরাম মেন্টেইন করে না। এমনও হতে পারে, সে আসলে প্রচণ্ড অহংকারী—স্ত্রীর মতামতকে ভবিষ্যতে পাত্তাও দেবে না। অপরদিকে এমনও হতে পারে: আপনার বাছাইকৃত মেয়েটি গায়রে মাহরাম মেন্টেইন করে না। হয়তো সে গিবত করাকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করেছে। হতে পারে, সে বিভিন্ন সিরিয়াল দেখায় মারাত্মকভাবে আসক্ত। এমনও হতে পারে, সে বাবা-মারই আনুগত্য করে না; ভবিষ্যতে আপনার কথা শুনবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। এমন অনেক অজানা সমস্যা থাকতে পারে, যেগুলো জানতে পারলে তার প্রতি আপনার মুগ্ধতা থাকবে না।
.
দুই.
এ-তো গেলো, তার অভ্যন্তরীণ দ্বীনদারির অবস্থা। তার দুনিয়ার জীবনেও হয়তো বড় কোনো দুর্বলতা আছে, যা আপনি বাহ্যিকভাবে বুঝতে পারছেন না। হতে পারে, তার চোখ দুটো দুনিয়াবি কামনা-বাসনায় পরিপূর্ণ, যা সে অন্যকে বুঝতে দেয় না। তার মধ্যে থাকতে পারে বিরক্তিকর কোন বদ-অভ্যাস, যা তার সাথে গভীরভাবে না মেশা পর্যন্ত কেউ বুঝতে পারবে না।
.
তিন.
শুরুর কথাগুলোতে ফিরে যাই। যার বাহ্যিক দ্বীনদারি দেখে আপনি মুগ্ধ, তার অজানা অনেক সমস্যা আপনি জানেন না। ফলে আপনার মুগ্ধতা দিনে দিনে এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যে, আপনি ভাবতেও পারছেন না—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার চেয়েও দ্বীনদার, কল্যাণকর এবং বেটার কাউকে আপনার জন্য মিলিয়ে দিতে পারেন। ব্যক্তিবিশেষের প্রতি মুগ্ধতার কারণে আপনি নিজেকে এক পর্যায়ে খুবই সস্তা ভাবতে শুরু করবেন। এমনকি আপনার ভেতর থেকে আত্মমর্যাদাবোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ গুণটি নিঃশেষ হতে থাকবে।
.
চার.
তাহলে সমাধান কী?
ইসলামই সমাধান। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, ব্যক্তিবিশেষের জন্য পাগলপারা হওয়া যাবে না; বরং চক্ষুশীতলকারী (قُرَّةُ أَعْيُنْ) কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে।
.
চক্ষুশীতলকারী মানে কি? এর মানে, যাকে দেখলে আপনার চোখ শীতল হয়ে যাবে! আপনি তাকে দেখলে তৃপ্তি পাবেন। তার সাহচর্যকে নিয়ামত মনে করবেন। ‘চক্ষুশীতলকারী’ এমন একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, যা ব্যক্তির মধ্যে দ্বীনি ও দুনিয়াবি কল্যাণসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নয়, সাধারণভাবে এই গুণবিশিষ্ট কাউকে আল্লাহর নিকট চাইতে হবে বেশি করে। মাথা থেকে এই ধারণা সরাতে হবে যে, ‘অমুকের চেয়ে ভালো কীভাবে পাব? অমুক তো আমার পরীক্ষিত’ ইত্যাদি। আল্লাহর কাছে বলুন, ‘আল্লাহ! আমার জন্য যে উত্তম হবে, তাকেই মিলিয়ে দিন।’ আরো বলবেন, ‘এমন কাউকে মিলিয়ে দিন, যার উপর আপনি সন্তুষ্ট এবং আমরা নিজেরাও একে অপরের উপর সন্তুষ্ট থাকবো।’ এভাবে কাউকে নির্দিষ্ট না করে ব্যাপকভাবে আল্লাহর কাছে চান। নিজে নির্দিষ্ট কাউকে চেয়ে পরে নিজেই আফসোস করার দরকার নেই।
.
প্রশ্ন আসতে পারে : তাহলে কি ‘নির্দিষ্ট’ কাউকে আল্লাহর কাছে চাওয়া জায়েয নেই? উত্তরে আলিমগণ বলেন, হ্যাঁ জায়েয। বিশেষত, কারও ব্যাপারে খুব ভালো জানাশোনা থাকলে, তাকে আল্লাহর কাছে চাওয়াতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা অনেকেই এক্ষেত্রে আবেগের কাছে হেরে যাই। বাহ্যিক কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে ফিদা হয়ে যাই। তাই, নিরাপদ হলো, আল্লাহর কাছেই নিজের পছন্দকে সোপর্দ করে দেওয়া। তার মানে কিন্তু এই না যে, আমরা খোঁজখবর নেবো না। অবশ্যই নেবো। আর, অবশ্যই ইস্তিখারা না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবো না।
.
পাঁচ.
আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরকে কেউ অতিক্রম করতে পারবে না। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে যতই সম্ভাবনাময় মনে হোক-না কেন, তাকদিরের ফয়সালা না থাকলে নির্দিষ্ট কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, আমরা যখন কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করি, আর সেই স্বপ্নটা ভাগ্যের বাস্তবতায় এসে ভেঙে যায়, তখন হতাশ হয়ে পড়ি। এজন্য আমাদের কখনই উচিত নয়—নির্দিষ্ট কাউকে নিয়ে স্বপ্নের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া বা নির্দিষ্টভাবে শুধু তার জন্যই মালিকের দরবারে দু‘আ করা; বরং আমরা সাধারণভাবে ‘চক্ষুশীতলকারী’ কাউকে কামনা করবো এবং তার জন্য আল্লাহর নিকট ফরিয়াদ জানাবো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বান্দাকে পরিতৃপ্ত করেন। এটুকু বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহর জন্য এটা কোনো ব্যাপারই না যে, তিনি উত্তম কাউকে মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে দিতে পারেন। অতএব, আল্লাহ্ ‘আযযা ওয়া জাল্লার উপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে।
.
হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, ‘‘আমার ব্যাপারে বান্দা যেমন ধারণা রাখে, আমি তার সাথে তেমনই (আচরণ করি)। আর সে যখন আমার নিকট দু‘আ করে, তখন আমি তার সাথেই থাকি (সাড়া দিই)।’’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৬৭২২]
.
অতএব, আল্লাহর সক্ষমতার সামনে নিজের আবেগ, মুগ্ধতা, বাস্তবতা—সবকিছুকে তুচ্ছজ্ঞান করতে হবে এবং তাঁর (আল্লাহর) ব্যাপারে সর্বোত্তম ধারণা রেখে উত্তম জীবনসঙ্গীর জন্য অবিরত দু‘আ করে যেতে হবে। পাশাপাশি, নিজেকেও সেভাবে প্রস্তুত করতে হবে। নেককার জীবনসঙ্গী চাওয়ার বিভিন্ন দু‘আ কুরআন-হাদিসে আছে। সেগুলো আমল করতে হবে। পাশাপাশি সকল গুনাহ, অবৈধ চ্যাটিং, কথা-বার্তা, কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ্ আমাদের নেক মনোবাসনা পূর্ণ করুন। আমিন।
.
(যারা ইতোমধ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন, বের হতে পারছেন না, তাদের জন্য একটি পর্বে ইতিবাচক আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ।)
.
----------------------------------
#বন্ধন (দ্বাদশ পর্ব)
বিয়ের মোহরানা কেমন হওয়া উচিত? ফাতেমী মোহরানা বলতে কী বুঝায়? মোহরানা সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কত হবে? (দলিলের আলোকে)
▬▬▬▬▬▬▬
▬▬▬▬▬▬▬
(১) বিয়ের মোহরানা সম্পর্কে ইসলামের নীতি:
.
বিয়ের মোহরানা হলো একজন নারীর সম্মানের বিষয়। স্বামী এটি তাকে উপহার দিয়ে সম্মানিত করে। তাই, এটি দিতে হয় খুশিমনে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহরানা দাও খুশিমনে, স্বপ্রবৃত্ত হয়ে।’’ [সুরা নিসা, আয়াত: ০৪]
.
(২) নবিজির মোহরানা কেমন ছিলো?
.
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান বলেন, আমি আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক মোহরানা কত ছিলো? তিনি বললেন, ‘নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদেরকে সাড়ে ১২ উকিয়া অর্থাৎ পাঁচ শ’ দিরহাম মোহরানা দিয়েছেন।’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৩৮০]
.
তখনকার সময়ে কারও কাছে ৫ উকিয়া থাকলেই যাকাত ফরজ হতো। সুতরাং সাড়ে ১২ উকিয়া যথেষ্ট পরিমাণ মোহর এবং সম্মানজনক মাল ছিলো। ৫০০ দিরহামের একটা হিসাব করা যাক।
.
১ দিরহাম = ২.৯৭ গ্রাম, সুতরাং ৫০০ দিরহাম = প্রায় ১৪৮৮ গ্রাম রৌপ্য। [এই হিসাবটি নেওয়া হয়েছে শায়খ মুহাম্মাদ সলিহ আল মুনাজ্জিদ (ফা. আ.) পরিচালিত islamqa(dot)info থেকে]
.
তবে, নবিজির এই পরিমাণটি আমাদের জন্য শরয়ি সুন্নাত নয়। কেউ চাইলে এটির উপর আমল করতে পারেন আবার নাও করতে পারেন। কারণ সালাফে সালিহিন হুবহু নবিজির নির্দিষ্ট মোহরানাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরেননি। কেউ এর চেয়ে বেশি দিয়েছেন, কেউ কমও দিয়েছেন। একজন সাহাবি ১ লক্ষ দিরহামে বিয়ে করেছিলেন। [ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান: ২১১৭; হাদিসটি সহিহ]
আবার বউকে কুরআন শেখানোর পরিশ্রমের বিনিময় হিসেবেও একজন হতদরিদ্র সাহাবিকে বিয়ে দিয়েছেন নবিজি। তাঁর কাছে এককথায় কিছুই ছিলো না। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০২৯]
এমনিতে সাহাবিগণের মাঝে ৪০০ দিরহামে মোহরানার মোটামুটি প্রচলন ছিলো। [ইমাম নাসায়ি, আস-সুনান: ৩৩৪৮; হাদিসটি সহিহ]
অর্থাৎ, এই বিষয়টি শরিয়তে অনেক প্রশস্ত।
.
(৩) মোহরানার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পরিমাণ:
.
মোহরানা সর্বোচ্চ কত হবে, তা ইসলাম ফিক্সড করে দেয়নি। সুতরাং কেউ যদি ৫০ কোটি টাকাও মোহর নির্ধারণ করে, তবে সেটি নাজায়েয হবে না। তবে, সাধারণভাবে ইসলাম বিয়েকে সহজ করতে বলে এবং মোহরানাও সহজ করতে বলে।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘সেই মোহরানা উত্তম, যেটি সহজতর।’’ [ইমাম বাইহাকি, সুনানুল কুবরা: ১৩৪৩১; শায়খ আলবানি, সহিহুল জামি’: ৩২৭৯; হাদিসটি সহিহ]
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘নারীর সৌভাগ্যের/বরকতের অন্যতম বিষয় হলো: তার বিয়ে সহজ হওয়া, তার মোহরানা সহজ হওয়া এবং তার গর্ভধারণ সহজ হওয়া।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ২৪৪৭৮; শায়খ আলবানি, সহিহুল জামি’: ২২৩৫; হাদিসটি হাসান]
.
আর সর্বনিম্ন মোহরানা কত হবে, এটি নিয়ে আলিমদের মাঝে কিছু মতভিন্নতা আছে। তবে, সেগুলো বেশ কাছাকাছি। আলিমগণের বড় একটি অংশ বলেছেন, খুব সামান্য পরিমাণ মাল দিয়েও মোহরানা আদায় হয়ে যাবে। যেমন: একটি হাদিসে আমরা দেখি, একজন হতদরিদ্র সাহাবিকে মোহরানার জন্য সামান্য লোহার আংটি জোগাড় করতে বলেছেন। [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫০২৯]
.
আবার ইমাম আবু হানিফা (রাহ.) বলেছেন, কমপক্ষে ১০ দিরহাম হতে হবে। এটি প্রায় ৩০ গ্রাম রৌপ্যের সমান। টাকার হিসাবে এটি বর্তমান বাজারমূল্যে প্রায় ১৭০০ টাকা। তিনি আকলি ও নকলি একাধিক দলিল দিয়েছেন এই পরিমাণের পক্ষে। যাহোক, মূলকথা হলো, সর্বনিম্ন মোহরানার পরিমাণ সব আলিমের মতেই যৎসামান্য।
.
মুফতি তাকি উসমানি (হা.) বলেন, ‘সর্বনিম্ন পরিমাণ মোহর নির্ধারিত থাকার অর্থ এই নয় যে, এত সামান্য পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করা শরিয়তে প্রশংসনীয়; বরং উদ্দেশ্য হলো, তার চেয়েও কম মোহরে বিয়েতে স্ত্রী রাজি থাকলেও সেটি শরিয়তসম্মত হবে না। কারণ এর দ্বারা মোহরের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। তাছাড়া মোহরের এই সর্বনিম্ন পরিমাণও রাখা হয়েছে আর্থিকভাবে দুর্বল লোকদের কথা বিবেচনা করে, যাতে তারাও নারীর সম্মতির শর্তে এই পরিমাণ অর্থ দ্বারা বিবাহ করতে পারে।’ [মাসিক আল কাউসার, মে-২০১১ সংখ্যা]
.
(৪) ফাতেমী মোহর বলতে আসলে কী বুঝায়?
.
সহজ কথায় বললে, নবিজির কন্যা ফাতিমা (রা.) ও আলি (রা.)-এর বিয়েতে যে মোহরানা ছিলো, সেটিই ফাতেমী মোহর। এর পরিমাণ ছিলো, ৫০০ দিরহাম। অর্থাৎ, নবিজি তাঁর স্ত্রীদের যে পরিমাণ মোহরানা দিতেন, সেই পরিমাণ। [ইমাম ইবনু আবি শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ: ১৬৬৩০; ইমাম ইবনু সা’দ, তবাকাতুল কুবরা: ৮/২২; ইমাম হাকিম, আল-মুসতাদরাক: ২৭৪২]
.
অন্য বর্ণনামতে, ৪৮০ দিরহাম। [ইমাম হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ: ৪/২৮৩]
আমরা ৫০০ দিরহামকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বর্তমানে প্রাচীন ১২ গ্রামের তোলার পরিবর্তে ১০ গ্রাম তোলার হিসাবে বেচাকেনা হয়। সেই হিসাবে ১৫৪ তোলা রৌপ্য হলো বর্তমানে ফাতেমী মোহরানা। বর্তমান বাজারে ১ তোলা রুপার মূল্য (২২ ক্যারেটে) ১৫১৬ টাকা। সেই হিসেবে ১৫৪ তোলা রুপার মূল্য হয় ১৫৪*১৫১৬ = ২৩৩৪৬৪ (প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার) টাকা। ১৮ ক্যারেটের রুপার হিসাবে হলে এই পরিমাণটা হয় ১৮৮৪৯৬ (প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার) টাকা।
.
মোহরানার ব্যাপারে আরেকটি পর্বে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
.
----------------------------------
#বন্ধন (ত্রয়োদশ পর্ব)
বিয়ের সময় দেওয়া গয়না কি মোহরানার অংশ? বাসর রাতে মোহরানার টাকা মাফ চাওয়া যায় কি? মোহরানার ব্যাপারে ভাই ও বোনদের প্রতি কিছু জরুরি পরামর্শ থাকলো।
.
❖ বিয়ের গয়না কি মোহরানার অংশ?
.
মুফতি তাকি উসমানি বলেন, ‘স্বামীর পক্ষ হতে নববধুকে যে গয়নাগাটি দেওয়া হয়, মোহরের সাথে তার সরাসরি সম্পর্ক নেই। আমাদের সামাজিক প্রচলন মতে স্ত্রী এই অলংকারের মালিক হয় না; বরং সেগুলো তাকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। ফলে স্ত্রী সেই অলংকার স্বামীর অনুমতি ছাড়া বিক্রি করতে পারে না এবং কাউকে উপহারও দিতে পারে না। আর এ কারণেই—আল্লাহ না করুন—তালাকের ঘটনা ঘটলে স্বামী এসব গয়নাগাটি ফিরিয়ে নেয়। এ ধরনের অলংকার দ্বারা মোহর আদায় হয় না। তবে, স্বামী যদি স্ত্রীকে স্পষ্টভাবে বলে যে, ‘আমি এই অলংকার মোহরস্বরূপ তোমাকে দিয়েছি এবং তুমি এর মালিক’ তাহলে সেই অলংকার মোহর হিসেবে গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে সেই অলংকারের উপর স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার থাকবে এবং কোনো অবস্থাতেই তা স্ত্রীর নিকট থেকে ফেরত নেওয়া যাবে না।’ [মাসিক আল কাউসার, মে-২০১১ সংখ্যা]
.
❖ সুন্নাতি মোহরানা বলতে কিছু আছে?
.
না, কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ মোহরানাকে শরয়ি মর্যাদার সুন্নাত বলেননি আলিমগণ। নবিজির স্ত্রী এবং কন্যাদের মোহরানার পরিমাণ (৫০০ দিরহাম)-কে সুন্নাত বলা না গেলেও, কেউ যদি শুধু নবিজির প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে এই পরিমাণকে নির্ধারণ করে, তাহলে ‘নবিজির প্রতি ভালোবাসা’ প্রদর্শনের জন্য নেকি পাবে। মোহরানার ব্যাপারটি অত্যন্ত প্রশস্ত। সাহাবিগণ নিজেরাও নবিজির পরিমাণে মোহরানা আদায় করেননি। কারণ স্থান, কাল, পাত্রভেদে মানুষের রুচি ভিন্ন ভিন্ন হয়। বর ও কনেপক্ষ মিলেই মোহরানা ঠিক করবে। তবে, সাধারণভাবে সহজ মোহরানাকে হাদিসে উৎসাহিত করা হয়েছে, যা আমরা আগের পর্বে লিখেছি। আর উত্তম মোহরানা হিসেবে আলিমগণের মতামত হলো: মোহরে মিসাল। অর্থাৎ কনের বোন, মা, খালা, কাজিনদের মোহরানার কাছাকাছি রাখা। অর্থাৎ কনেপক্ষের অন্যান্য নারীদের মোহরানার প্রায় সমপরিমাণ (কিছু কম-বেশি) রাখা উত্তম। এতে করে নতুন কনের মর্যাদা সমুন্নত থাকে। তবে, এটি জরুরি কিছু নয়।
.
❖ মোহরানা আদায় না করা বা গড়িমসি করা:
.
যে স্বামীর মনে মোহর আদায় করার ইচ্ছা থাকে না, হাদিসে তাকে ‘ব্যভিচারী’ বলা হয়েছে। [শায়খ আলবানি, সহিহুত তারগিব: ১৮০৭; অন্যান্য শাহিদ (সাক্ষী) হাদিসের ভিত্তিতে আলবানি (রাহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
.
স্বামী যদি চাপ দিয়ে বা কৌশলে পূর্ণ মোহর বা কিছু অংশ মাফ করিয়ে নেয়, তাহলে আল্লাহর বিচারে তা মাফ হবে না। [ইমাম জাসসাস, আহকামুল কুরআন: ২/৫৭-৫৮; ইমাম ইবনু কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আযিম: ১/৪৪২]
.
❖ মোহরানাকে কঠিন বানিয়ে ফেলা:
.
উমর (রা.) বলেন, ‘তোমরা নারীদের মোহরানার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না।...কখনও অধিক মোহরানা স্বামীর উপর বোঝা হয়ে দদাঁড়ায়।’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৮৮৭; হাদিসটি হাসান সহিহ]
.
❖ স্ত্রী কর্তৃক মোহরানা মাফ করা বা কমানো:
.
যদি কোনো স্ত্রী স্বেচ্ছায় (কোনো চাপে না পড়ে) তার মোহরানা মাফ করে দেয়, তাহলে সেটি স্বামীর প্রতি বিরাট অনুগ্রহ। আবার সে চাইলে মোহরানার কিছু অংশ মাফ করতে পারে। তবে, এটি একান্তই তার ইচ্ছার ব্যাপার।
.
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তোমরা নারীদেরকে তাদের মোহর দাও খুশিমনে স্বপ্রবৃত্ত হয়ে। এরপর তারা যদি স্বেচ্ছায় নিজের আগ্রহে তোমাদের জন্য কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তাহলে তা স্বাচ্ছন্দে ভোগ করো।’’ [সুরা নিসা, আয়াত: ০৪]
.
❖ বোনদের প্রতি আমাদের পরামর্শ:
.
মোহরানার সম্পূর্ণ অংশ মাফ করা উচিত নয়। স্বামীর প্রতি অনুগ্রহ করে কিছু পরিমাণ মাফ করতে পারেন, যদি স্বামীর জন্য এটা কঠিন হয়ে পড়ে। মোহরানার টাকা বা সম্পদকে আপনি যত্ন করে রেখে দিতে পারেন। ভবিষ্যতে এ থেকে আপনি নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনকে সাহায্য করতে পারেন। দান-সাদাকাহ করতে পারবেন। এমনকি নিজের স্বামী-সন্তানকে বা বান্ধবীদেরকে মাঝেমধ্যে উপহার দিতে পারেন। এরকম আরও অনেক কিছুই করতে পারেন। আরে ভাই, টাকা তো দরকারি জিনিস। অনেক কাজেই মোহরানার টাকা ব্যবহার করে আপনি উপকৃত হতে পারেন এবং অনেককে খুশি করতে পারেন। আবার ধরেন, স্বামী বিপদে পড়েছে, তাহলে তাকে ধারও দিতে পারেন। তবে, এতসব চিন্তা মাথায় নিয়ে যদি বিশাল অংকের মোহরানা স্বামী বেচারার উপর চাপিয়ে দেন, তাহলে সেটি দুঃখজনক। এমনিতেই বিয়ের বাজারে জামাইদেরকে ধরে ছিলে দেওয়া হয়। সুতরাং এখানে আদল-ইনসাফ কাম্য। ‘তালাক যাতে না দিতে পারে’ এই চিন্তা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত মোহরানা হাঁকিয়ে আল্লাহর বরকত ও রহমত আশা করা যায়? শুধু মোহরানা দিয়ে সংসার আটকে রেখে উভয়ের জীবন জাহান্নাম বানিয়ে দিনশেষে লাভটা কার?
.
❖ ভাইদের প্রতি পরামর্শ:
.
ভাই, আপনি এখন থেকেই মোহরানার জন্য টাকা জমাতে থাকুন। পুরুষ হয়েছেন, সুতরাং দায়িত্ব আর চ্যালেঞ্জের বোঝা আপনাকে বহন করতেই হবে। প্রিয় জীবনসঙ্গীনীকে সম্মানজনক মোহরানার মাধ্যমে ঘরে তুলুন। বাসর রাতে কাপুরুষের মতো মিউ মিউ করে মাফ চাইতে যাবেন না। প্রয়োজনে সময় চেয়ে নিন। বিয়ের বৈঠকে ফর্মালিটিজ আর আত্মসম্মানের ভয়ে বিশাল অংকের মোহরানা মেনে নেবেন না। বরং যেটুকু আপনার সাধ্যে হবে, সেটুকু নির্ধারিত করুন। আল্লাহ সাহায্য করবেন।
.
----------------------------
#বন্ধন (চতুর্দশ পর্ব)
নারী-পুরুষের প্রেম-ভালোবাসা কি হারাম? যারা বিবাহবহির্ভূত হারাম সম্পর্কে জড়িত, তাদের ব্যাপারে কিছু সমাধানমূলক কথা:
.
সমস্যা নিয়ে কথা বলা তো খুব সহজ, কিন্তু সমাধান দেখিয়ে দেওয়ার কাজটা বেশ কঠিন।
.
(১) সাধারণভাবে মানুষ ঈমানি দুর্বলতার কারণে পাপে জড়ায়। বিবাহবহির্ভূত হারাম সম্পর্কও একটি পাপ। প্রেমে পড়লে নিচের হাদিসের এক বা একাধিক বিষয় ঘটে।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘নিঃসন্দেহে দু’চোখের ব্যভিচার হলো তাকানো, দু’কানের ব্যভিচার হলো (কামনার সাথে) শোনা, জিহ্বার ব্যভিচার হলো (কামনামিশ্রিত) কথোপকথন করা, হাতের ব্যভিচার হলো স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার হলো (কামনা চরিতার্থে) হেঁটে যাওয়া, অন্তরের ব্যভিচার হলো কামনা-বাসনা করা। আর লজ্জাস্থান একে সত্য করে বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। (অর্থাৎ, ফাইনালি লজ্জাস্থানের মাধ্যমেই চূড়ান্ত ঘটনা ঘটে)।’’ [ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৬৬৪৭]
.
(২) যদি কেউ কোনোভাবে কারও প্রেমে পড়ে যায়, তাহলে তার কর্তব্য হলো, সে এ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। কোনোভাবেই তার দিকে তাকাবে না, তার সাথে প্রেমালাপ করবে না, নির্জনে দেখা-সাক্ষাৎ করবে না।
.
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীর সাথে নির্জনে একত্র হয়, তখন সেখানে তৃতীয়জন হয় শয়তান।’’ [ইমাম আহমাদ, আল-মুসনাদ: ১৭৭; ইমাম তিরমিযি, আস-সুনান: ১১৭১; হাদিসটি সহিহ]
.
আল্লাহ তা‘আলা রাসুলের স্ত্রীগণকে (সকল মুসলিম নারীর ব্যাপারেও হুকুম একই) উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘‘তোমরা (পর-পুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যার কারণে—যার অন্তরে রোগ আছে— সে প্ৰলুব্ধ (লালায়িত) হয়, বরং তোমরা ন্যায়সংগত (স্বাভাবিক) কথা বলবে।’’ [সুরা আহযাব, আয়াত: ৩২]
.
(৩) প্রেম হলো রোগ আর চিকিৎসা হলো বিয়ে!
.
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘‘একে অপরের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী দুজনের মাঝে বিবাহের মতো (উত্তম) আর কিছু নেই।’’ [ইমাম ইবনু মাজাহ, আস-সুনান: ১৮৪৭; হাদিসটি সহিহ]
.
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিবাহবহির্ভূত হারাম সম্পর্কের ব্যাপারে আমরা অনেকে লোকদের সতর্ক করলেও এই হাদিসটির আলোকে সমাধানের কথা তেমন বলি না। অথচ এটি একটি বিশুদ্ধ ও যথার্থ সমাধানমূলক হাদিস। এক বাক্যে ব্রেকআপ করাকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে প্রচার করি। এটি দুঃখজনক।
.
(৪) যারা ইতোমধ্যে হারাম প্রেমে জড়িয়ে গেছেন, একে অপরকে প্রকৃত অর্থেই ভালোবাসেন এবং তাদের দ্বীনদারির ব্যাপারে ভালো আশা রাখেন, তাদের কর্তব্য হলো: বিয়ের মাধ্যমে নিজেদের সম্পর্কটাকে হালাল ও পূর্ণতা দেওয়া।
.
(ক) অনেকে বাসায় বিয়ের কথা বলতে লজ্জা পায় আর নিজের পক্ষে সাফাই দেয়, ‘এই মুহূর্তে আমাদের পরিবার আমাদের বিয়ে সমর্থন করবে না।’ এটা উচিত নয়। হারাম থেকে বাঁচতে প্রয়োজনে বেহায়ার মতো বারবার বিয়ের কথা বলবেন অথবা অন্যদের দিয়ে বলাবেন।
(খ) যদি অনেক চেষ্টার পরও অভিভাবককে রাজি করাতে না পারেন, তাহলে হানাফি মাযহাব মতে, তাদের অনুমতি ব্যতীত বিয়ে করে নিলে সেটি বৈধ হবে। তবে, সামগ্রিক কল্যাণ বিবেচনায় আমরা এটিতে নিরুৎসাহিত করি। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই এটির ফলাফল ভালো হয় না।
.
(৫) হারাম সম্পর্কে জড়িত, কিন্তু অভিভাবক একদমই রাজি না, তাই বিয়ে করতে পারছেন না, এমন যারা আছেন, তাদেরকে অবশ্যই থামতে হবে। আল্লাহর দেওয়া সীমারেখা লঙ্ঘন করা যাবে না। বিয়ের আগ পর্যন্ত দেখা-সাক্ষাৎ, কথা-বার্তা, একান্তে মিলিত হওয়া ইত্যাদি কাজ থেকে বিরত থাকবেন। নিজেদের যৌনকামনা নিবারণের জন্য বেশি বেশি নফল রোজা রাখবেন, সবর করবেন এবং আল্লাহর সাহায্য চাইবেন। তাহলে আল্লাহ ধৈর্যধারণের জন্য নেকি দেবেন, যেমনটি বলেছেন ইবনুল কায়্যিম (রাহ.)।
.
যদি তাকেই বিয়ে করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন, তাহলে মাঝেমধ্যে পারিবারিকভাবে যোগাযোগ রাখবেন। আর পরিবার রাজি না থাকলে, মেয়ের কোনো মাহরামের উপস্থিতিতে কয়েক মাস পরপর সীমিত পরিসরে কিছু সময় কথা বলবেন। তবে, সেই কথা শুধু বিয়ের অগ্রগতি নিয়ে হবে, যথাযথ পর্দার মধ্যে, স্বল্প সময়ে। এখানে কোনো প্রেমালাপ হবে না। সম্ভব হলে এই কাজটি অনলাইনে করবেন (কোনো মাহরামের জ্ঞাতসারে)। সামনাসামনি দেখা-সাক্ষাৎ করবেন না। তবে, এক্ষেত্রে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। এই পয়েন্টে যেসব কথা বলা হলো, এগুলো একদম মার্জিনের কথাবার্তা। এগুলো ক্রস করা মানে হারামে জড়ানো। সুতরাং সাবধানতা কাম্য।
.
(৬) প্রেম-ভালোবাসা অনেক সময় মানুষকে উন্মাদ বানিয়ে দেয়। প্রেমিক-প্রেমিকারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। যেমনটি আমরা দেখি নবিজির সাহাবি মুগিস (রা.)-এর বেলায়। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রী বারিরার বিচ্ছেদ ঘটলে তিনি পাগলের মতো হয়ে যান! সাহাবি ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, যেন আমি এখনও দেখতে পাচ্ছি সেই দৃশ্য যে, মুগিস কাঁদতে কাঁদতে বারিরার পেছনে মদিনার অলিতে-গলিতে ছোটাছুটি করছে আর তার দাড়ি বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে!
.
মুগিসের এই ভালোবাসার পাগলামি দেখে স্বয়ং নবিজি পর্যন্ত বারিরাকে বলেছিলেন, ‘‘তুমি যদি তার কাছে আবার ফিরে যেতে!’’ তখন বারিরাহ (রা.) বলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি আমাকে এই বিষয়ে আদেশ দিচ্ছেন? (কারণ নবিজির আদেশ মানা ফরজ)’ তখন নবিজি বলেন, ‘‘না, আমি কেবল সুপারিশ করছি।’’ তখন বারিরাহ বলেন, ‘তাকে আমার দরকার নেই।’ [ইমাম বুখারি, আস-সহিহ: ৫২৮৩]
.
[বারিরাহ এবং মুগিস দুজনই ছিলেন ক্রীতদাস-ক্রীতদাসী সাহাবি। বিধান হলো, কোনো ক্রীতদাসী নারী স্বাধীন হয়ে গেলে আর তার স্বামী তখনও ক্রীতদাস থেকে গেলে, সেই নারীর এই এখতিয়ার থাকতো যে, সে চাইলে ক্রীতদাস স্বামীর সংসার করতে পারে আবার বিচ্ছেদও ঘটাতে পারে। তবে, এই বিচ্ছেদ ঘটানোর পর অন্য পাত্রকে বিয়ে না করেও আগের বিয়ে নবায়ন করা যায়। মূলত বারিরাহ (রা.) স্বাধীন হওয়ার পরই তাঁর স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটান। তিনি স্বামীকে অপছন্দ করতেন আর স্বামী তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন। (ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ: ৩৬৭২)]
.
এই ঘটনার উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নবিজি মুগিসকে তার পাগলামি থামাতে বলেননি, অথচ মুগিস তখন বারিরার জন্য নন-মাহরাম। কারণ এটা এমন পর্যায়ের পাগলামি, যেটাতে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমন অবস্থায় যদি সরাসরি কোনো হারামে না জড়ায় (যেমন: স্পর্শ, নির্জনে সাক্ষাৎ, চুমুু খাওয়া ইত্যাদি) তাহলে আশা করা যায়, আল্লাহ এই লোকদের উযর (অপারগতা) ক্ষমা করবেন।
.
পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদিন এবং অন্যান্য রহমদিল ব্যক্তিগণও এই ধরনের লোকদের পক্ষে সুপারিশ করতেন এবং বিয়ের মাধ্যমে তাদের মিলিয়ে দিতেন। এদের পাগলামি তাঁদের মনকে নাড়া দিতো। একবার এক বেদুইন এক নারীর জন্য বেদনায় কাতরাচ্ছিলো আর মনের মাধুরী মিশিয়ে মেয়েটির জন্য কবিতা পড়ছিলো। তখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন চতুর্থ খলিফা আলি (রা.)। তিনি সব শুনে তার সাথে মেয়েটির বিয়ের ব্যবস্থা করে দেন। [ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম, আদ-দা ওয়াদ দাওয়া (রোগ এবং তার প্রতিকার), পৃষ্ঠা: ৫৫৯]
.
প্রাচীন আরবের আরেকটি ঘটনা লোকদের মুখে বেশ প্রসিদ্ধ ছিলো। চাচাতো বোন আফরার প্রতি উরওয়ার ভালোবাসা ছিলো সীমাহীন। আফরার বাবা উরওয়ার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অন্য ব্যক্তির সাথে আফরাকে বিয়ে দিয়ে দেন। এই শোকে উরওয়া কাঁদতে কাঁদতে শেষ পর্যন্ত মারা গেছে! উমর (রা.) একবার বলেছিলেন, ‘আমি আফরা ও উরওয়াকে পেলে তাদের দুজনকে (বিয়ের মাধ্যমে) মিলিয়ে দিতাম!’ [ইমাম ইবনুল জাওযি, যাম্মুল হাওয়া, পৃষ্ঠা: ৪২০]
.
শেষ কথা: এসব ঘটনা থেকে কেউ হারাম প্রেমের সমর্থন খুঁজবেন না। পর-নারীর সাথে নির্জনে দেখা-সাক্ষাৎ করা, কথা বলা, স্পর্শ করা, চুমু খাওয়া সবই হারাম কাজ। এমনকি অন্তরে তার ব্যাপারে কামনা-বাসনা রাখাও জায়েয নেই। তবে, সকল প্রচেষ্টার পরও যদি মন থেকে কোনোভাবে সরানো না যায়, তাহলে আল্লাহ ক্ষমা করবেন বলে আশা করা যায়। ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহ.)-সহ আলিমগণের মত এটাই। আর, কোনো মুসলিম মেয়ে বা ছেলেকে জীবনসঙ্গী হিসেবে জাস্ট মনে মনে পছন্দ করা বা তার ভালোর জন্য দু‘আ করা কিংবা তাকে পাওয়ার জন্য দু‘আ করা জায়েয, যদি চিন্তা ও কল্পনায় কামনা-বাসনা না থাকে। তবে, নির্দিষ্ট কাউকে না চেয়ে আল্লাহর কাছে নিজের যেখানে কল্যাণ আছে, তাকে চাওয়াই উচিত এবং উত্তম। আগের পর্বে এ নিয়ে আলোচনা করেছি।
.
এর মধ্য দিয়ে আমাদের বন্ধন সিরিজটি সমাপ্ত হলো, আলহামদুলিল্লাহ।
.
-------------------------------
©Nusus
Page link- https://www.facebook.com/FromNusus
.