JustPaste.it

দেশে দেশে ইসলাম

 

আঁধার চিরে আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ঃ

ইসলামী প্রজাতন্ত্র চেচিন চেঙ্গিসতিয়া

নাসীম আরাফাত

=================================================

 

        কৃষ্ণ আর কাস্পিয়ান সাগরের মাঝে ভয়াল বন্ধুর ককেশাস পর্বতমালাকে বুকে নিয়ে দাড়িয়ে আছে সীসান পর্বতমালা। বিপদ সংকুলতা আর বন্ধুরতায় যা খুবই মশহুর। যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হায়েনাদের অবাধ আনাগােনা, ভয়াল হিংস্র তেজস্বী চিতার যেখানে নির্বিঘ্ন বিচরণ। সিংহের পৃথি-প্রকম্পিত হুঙ্কার, আর শাহীনের আকাশের মােহন নীলিমায় পক্ষ বিস্তার করে সতর্ক প্রদক্ষিণ যেখানে নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার-সব সময়ের প্রকৃতির এই বিরূপ ভয়াবহতার কোলে লালিত ককেশীয় মুসলিম জনতা তাই চির দূরান্ত, দুর্বার। পদে পদে তারা মৃত্যুকে জয় করে সম্মুখ সমরে এগিয়ে চলে দৃঢ় পদক্ষেপে, অকুতভয়ে। সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া আজ বাধ্য হয়ে ককেশাস মুসলিম জনগণের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি চেচিন থেকে প্রাপ্ত এক তাজা খবরে জানা গেছে যে, চেচিন প্রজাতন্ত্রের পার্লামেন্ট সদস্যদের আমন্ত্রণে রাশিয়ার উচ্চপদস্থ এক প্রতিনিধিদল রাজধানী গারােজনীতে পৌছেছে এবং উষ্ণ-শীতল আলােচনা-পর্যালােচনার পর তারা ঐকমত্যে পৌছেছে যে, রাশিয়া চেচিন প্রজাতন্ত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিবে এবং বিশ্বের দরবারে তাকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বলে স্বীকৃতি প্রদান করবে । অবশ্য তাকে পেট্রোলিয়াম ও অন্যান্য খনিজ দ্রব্যে অর্থনৈতিক সুযােগ সুবিধা দিতে হবে রাশিয়াকে । চেচিন বলেছে, তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমস্যা ও তার সমাধান খুঁজে বের করতে অবশ্যই উদারনীতি গ্রহণ করবে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোন পারস্পরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত বা ঘােষিত হয়নি । আগামী দু'এক মাসের মধ্যেই এব্যাপারে আনুষ্ঠানিক ভাবে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। ফলে অন্ধকারের সকল বাঁধা চিরে পৃথিবীর মানচিত্রে আরেকটি মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটবে।

 

        রুশ সামাজ্যবাদীর কবল থেকে মুক্তির জন্য উত্তর ককেশাসে চেচিন ইঙ্গিসতিয়ার মত আরাে কয়েকটি মুসলিম অঞ্চল সুদীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র রক্তাক্ত জিহাদ চালিয়ে আসছে। ইমাম শামেলীর দেশ দাগিস্তান আসকীলিয়া, কবারতায়ী, আখুমী এবং আদফা তন্মধ্যে উল্লেখযােগ্য। সম্প্রতি জানা গেছে, যে, চেচিন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র প্রধান জওহর মুসা দাউদের আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়ে উক্ত অঞ্চলের সর্দার ও নেতারা রাজধানী গরােজীতে সমবেত হয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করেছে যে, তারা উত্তর ককেশাসে এক কনফেডারেশন রাষ্ট্র গড়ে তুলবে। রাজধানী গরােজীনী হবে তার কেন্দ্র। এ কনফেডারেশনের মূলনীতি তৈরির জন্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নেতাসহ সকলে মিলে ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ পরিষদের নাম ঘােষণা করেছে, যারা দ্রুত সংবিধান রচনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

চেচিন ইঙ্গিসতিয়ার গৌরবময় ইতিহাস 

        উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের কথা। রুশ জার সম্রাট হঠাৎ উত্তর ককেশাসের মুসলিম অঞ্চলগুলােতে নৃশংস আক্রমণ চালায়। অঘােষিত আক্রমণের আকস্মিকতায় দিশেহারা মুসলিম জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরােধের পাহাড় গড়ে তুললেও তারা বেশীক্ষণ স্থির থাতে পারেনি। পর্যুদস্ত মুজাহিদরা ইমাম শামেলীর অঞ্চল দাগীস্তানে গিয়ে জড়াে হয়। ইমাম শামেলীর পতাকা তলে একত্রিত হয়ে তারা নতুন করে জিহাদের শপথ নেয় এবং ইমাম শামেলীসহ সকলে আযাদী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। তারা ককেশাস মুসলমানদেরকে ইমানের দাওয়াত দেয়। ইসলামের সৌহার্দ্যের বাণী শুনালেন তাদেরকে । কুংস্কার ও জাহেলী চিন্তা-ধারণা, আকীদা-বিশ্বাস থেকে তাদের মুক্ত করে অকৃত্রিম প্রীতি-ডােরে আবদ্ধ করলেন। জিহাদের অগ্নিবাণী শুনিয়ে আল্লাহর রাহে প্রাণ দিতে তাদের অনুপ্রাণিত করলেন। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই গড়ে উঠলাে এক মৃতুঞ্জয়ী কাফেলা। এমন সময় হঠাৎ একদিন রুশ বাহিনী আযাদী আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল আক্রমণ করে তা ধ্বংস করে দেয়। মুজাহিদ কাফেলা এবার চেচিনে এসে আশ্রয় নেয়। চেচিন অধিবাসীরা দাগীস্তানী মুজাহিদদের হাসিমুখে বরণ করে নেয় এবং ইমাম শামেলীর নেতৃত্বে জিহাদ চালিয়ে যাবার শপথ গ্রহণ করে। এবার গড়ে উঠে এক বিশাল দুর্ধর্ষ বাহিনী-এক মরণজয়ী মুজাহিদ কাফেলা। মৃত্যু যাদের পুতুল খেলা, মৃত্যু যাদের মহা প্রভুর মিলন সেতু।

 

        ১৮৩৯ সালে ইমাম শামেলীর কমাণ্ডে এ মুজাহিদ কাফেলা আক্রমণ করে রুশ বাহিনীর ওপর। যারা ছিলাে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত। কিন্তু মুজাহিদদের দৃঢ় মনোবল ও ঈমানী শক্তির সামনে তাদের অস্ত্রবল কোন কাজেই আসেনি। তাদের নিকট রুশ বাহিনী নির্মমভাবে পরাজয় বরণ করে। মুজাহিদরা এবার চেচিন- দাগিস্তান সহ বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে গড়ে তােলে এক ইসলামী হুকুমত । প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহর আইন। সুদীর্ঘ বিশ বছর পর্যন্ত প্রতাপের সাথে সেখানে ইসলামী অনুশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলাে।

 

        ১৮৫৯ সালে গুনীবের রণক্ষেত্রে ইমাম শামেলীর অনুসারী ও জার বাহিনীর মাঝে এক রক্তাক্ত ভয়াবহ সংঘর্ষ হলে ইমাম শামেলীর অনুসারীরা পরাজিত হয়। ফলে দাগীস্তান ও চেচিন সহ পার্শ্ববর্তী মুসলিম অঞ্চলগুলাে রুশ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়, ইসলামী অনুশাসন রহিত হয়ে যায় । কিন্তু চেচিনের মুজাহিদরা দুর্গম পাহাড়ে আত্মগােপন করে রুশ বাহিনীর উপর চোরাগুপ্তা হামলা চালাতে থাকে। তাদের আক্রমণে রুশ বাহিনী বিদিশা হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৮৬৪ সালে রুশ বাহিনী এক ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে গােটা চেচিন দখল করে নেয়। এরপর বাহ্যত মুজাহিদদের জিহাদী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও আজাদী পাগল মুজাহিদরা চেচিনবাসীদের হৃদয়ে জিহাদের যে অগ্নি-স্পৃহা রেখে যায় তা ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে। তারা মুজাহিদদের বীরত্বের কাহিনী শুনিয়ে শিশু- কিশােরদেরকে জিহাদী ভাবধারায় গড়ে তােলে। চেচিনের শিশু-কিশােররা আজো মুজাহিদ কমাণ্ডার শহীদ ঝিলাম খানের কথা ভুলেনি। যিনি মরণজয়ী মুজাহিদ কাফেলা নিয়ে বীর বিক্রমে বার বার রুশ বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে ছিলেন। মৃত্যুর দেশে পাঠিয়েছিলেন অসংখ্য রুশ সেনা ও তাদের দোসরদেরকে।তাই ঝিলাম খান চেচিন বাসীদের নিকট বীরত্বের প্রতীক। ঝিলাম খানকে নিয়ে রচিত হয়েছে বহু কাহিনী আর গীতিকা। রাজধানী গরােজীর কেন্দ্রস্থলে ঝিলাম খান মিউজিয়াম আজো তার অক্ষয় স্মৃতি বহন করে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে।

 

রাশিয়ার নিরব পরাজয় 

        সােভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর পরই উত্তর ককেশাসের চেচিন প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘােষণা করে। রাশিয়া অবশ্য চেচিন প্রধান জেনারেল জওহার দাউদকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টায় এতটুকু ত্রুটি করেনি। কিন্তু তার সকল কূটকৌশলই ব্যর্থ হয়েছে। এদিকে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙ্গে পড়া রাশিয়ার পক্ষে সামরিক অভিযানের ব্যয় বহন করাও দুসাধ্য। এছাড়া এ অঞ্চলে সামরিক অভিযানে সফল হওয়ার ব্যাপারেও রাশিয়া ছিলাে দারুন সংকটগ্রস্ত। চেচিন প্রধান জওহর দাউদ পরিস্থিতি আঁচ করে হুসিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন যে, রাশিয়া যদি চেচিন সমস্যার সমাধান অস্ত্রের বলে করতে চায় তবে এ যুদ্ধ মস্কো থেকে আরম্ভ করে রাশিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। কারণ চেচিনের বাইরেও এক লক্ষ ত্রিশ হাজার চেচিন মুজাহিদ রাশিয়ার স্থাপনার উপর হামলার জন্য সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।       এছাড়াও রাশিয়ার বিভিন্ন শহর বন্দরে ককেশাসের  আড়াই লক্ষ মুসলমান বসবাস করছে।

 

        যারা মাতৃভূমি, চেচিনের স্বাধীনতার দাবীতে প্রাণ উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত। চেচিনের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের ধারণা, চেচিন প্রজাতন্ত্রকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাদের ওপর অর্থনৈতিক, সামরিক বা অন্য কোন শর্তারােপ ও বাধ্যবাধকতা একেবারই নিল কুর্দনে পর্যবসিত হবে। তাদের ভাষ্য হলাে, চেচিনের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রশ্নে নেতিবাচক কোন পদক্ষেপই রাশিয়ার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। রাশিয়া হয়ত চেচিনের স্বাধীনতার এ দাবী বহু পূর্বেই মেনে নিতাে, কিন্তু ইতিমধ্যেই রাশিয়ার মিত্র ওসােনিয়ার সাথে আনগুস প্রজাতন্ত্রের যুদ্ধ বাধলে রাশিয়া শান্তি ও শৃঙ্খলার নামে যুদ্ধ বিমান ও ট্যাঙ্কসহ হাজার হাজার সৈন্য ওসােনিয়ায় প্রেরণ করে।

 

        রুশ সৈন্য বাহিনী গুস আক্রমণ করে তা পর্যুদস্ত করে চেচিন প্রজাতন্ত্রের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়। দেখতে দেখতে চেচিন সীমান্তে রুশ ট্যাঙ্ক ও মিসাইল সহ রুশ হানাদার বাহিনী এসে সমবেত হয় এবং প্রচণ্ড গােলা বর্ষণ করতে থাকে। চেচিন প্রধান জওহর দাউদ এতে বিচলিত না হয়ে সাহসের সাথে রুশ বাহিনীকে যুদ্ধের আহবান জানান এবং হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, বিশ ঘণ্টার মধ্যে সৈন্য ফিরিয়ে না নিলে চেচিন মুজাহিদদের আক্রমণে সব অস্ত্র-সস্ত্র ও সৈন্য ধুলােয় মিশিয়ে দেয়া হবে। ককেশীয় বীর-বাহাদুরদের শৌর্য-বীর্য আর সাহসীকতার কথা রুশ সৈন্য শিবিরে অজ্ঞাত ছিল না। অজ্ঞাত ছিল না জওহার দাউদের সামরিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কথা। তারা আজো ভুলেনি ককেশাসের নিশ্ছিদ্র অরণ্যে আর পর্বতের কন্দরে করে মুজাহিদদের আক্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতা আর মৃত্যুর কথা। তাই রুশ বাহিনী ছিল ভীত সন্ত্রস্ত। এদিকে জাওহার দাউদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজধানী গারােজনীতে হাজার হাজার মরণজয়ী মুজাহিদ সমবেত হলাে। রাশিয়া এবার টের পেল যে, জওহার দাউদের যুদ্ধের আহ্বান কোন ছেলে খেলা নয়। ফলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট রবিস ইয়েলৎসিন সহ রুশ পার্লামেন্ট সদস্যরা ঘাবড়ে যায় । এবার জওহারের দেয়া সময়সীমার মধ্যেই ইয়েলৎসিন সকল সৈন্য ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

 

         প্রখ্যাত আমেরিকান ঐতিহাসিক নাগার নরলী কেলাম স্বীয় রচিত গ্রন্থে লিখেনঃ “চেচিন ও দাগিস্তানে ইমাম শামেলীর নেতৃত্বে প্রথম যুদ্ধে ককেশাস রণক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার পাচ লাখ সৈন্য নিহত হয়। এদের মাঝে ছিলাে অসংখ্য সামরিক অফিসার ও জেনারেল। তাই রুশ ক্ষমতাসীনদের চেচিনের সাধারণ জনগণের দুর্ধর্ষতা ও সাহসিকতা ভাবিয়ে তােলে। যেদিন রুশ বাহিনী ট্যাঙ্ক নিয়ে চেচিন সীমান্তে অগ্রসর হয়েছিল সেদিন চেচিন জনগণ থেকে তারা কেমন বাধার সম্মুখীন হয়েছিল তা এক রুশ ট্যাঙ্ক চালকের সংলাপেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। সে বলেছেঃ “আমরা যখন ট্যাংক বহর নিয়ে চেচিনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম, তখন এক টগবগে তরুণ আমাদের ট্যাঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে যায়। দুর থেকে আমরা উচ্চ স্বরে বললাম, সরে দাঁড়াও, নাহলে পিষে ফেলবাে। আমাদের কথা শুনে যুবকের অধরে ব্যাঙ্গপূর্ণ হাসি ফুটে উঠলাে! টু শব্দ না করে সে জ্যাকেটের বুতাম খুলে ফেলে। দেখলাম, বুকে তার কয়েকটি মারাত্মক বোমা বাধা রয়েছে। নিঃসন্দেহে এ যুবকটি গােটা ককেশাসবাসীর বীরত্ব ও সাহসীকতার প্রমাণ বহন করে। তার কোরবানী একথা ঘােষণা করছে, চেচিনের বুকে আমার মত হাজার হাজার যুবক রয়েছে, তাদের লাশের উপর দিয়েই রুশ ট্যাঙ্ক বহরকে সামনে অগ্রসর হতে হবে। যদি তারা একটি লাশের উপর দিয়েও যাওয়ার ইচ্ছা করে তার পরিনাম কি হবে তা পূর্বেই ভেবে নেয়া উচিত হবে।”

 

        কিন্তু বড় দুঃখের বিষয় যে, আজো কোন মুসলিম দেশ বা কোন আরব রাষ্ট্র চেচিন প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার সপক্ষে কোন একটি বাক্য উচ্চারণ করছে না। কাজিকিস্তান, তাজিকস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজ, তুর্কমেনিস্তান ও অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার সপক্ষে তারা প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখলেও চেচিনের স্বাধীনতার ব্যাপারে তারা কোনই পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। বিশ্বের দরবারে তার . স্বাধীনতার দাবীটুকু তুলে ধরার কেউ কি নেই? মানবাধিকারের ধ্বজাধারী পশ্চিমা বিশ্বও এ ব্যাপারে নিরব। অত্যাশ্চর্য বিষয় যে, পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলাে কোন ব্যাপারে কথা না বলে মুসলিম দেশগুলাে তা বিশ্বাসই করতে চায় না। এর চেয়ে দুঃখ ও দুর্ভাগ্য আর কি হতে পারে! আসুন চেচিন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান জওহার দাউদের মুখেই মুসলিম বিশ্বের নিরবতা সম্পর্কে তার হৃদয়ের ব্যাথার কথা শােনা যাক। উত্তর ককেশাসের এক নামকরা সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছেঃ

 

        মাননীয় রাষ্ট্রপতি! চেচিন প্রজাতন্ত্র তার শানদার ইতিহাস ও স্বর্ণোজ্জল অতীত নিয়ে গর্বিত । কিন্তু আজো কোন মুসলিম দেশ বা আরব রাষ্ট্র তার স্বাধীনতার দাবীর পক্ষে কথা বলছে না। এব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া বা অনুভূতি জানতে পারি কি?

 

        “আল্লাহ মুসলিম দেশগুলাের প্রধানদের সুবােধ দান করুন। মুসলিম দেশগুলাের স্বাধীনতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। রাশিয়ার অন্যান্য প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার ব্যাপারে তারা যে ভূমিকা রেখেছে তাতে আমরা আনন্দিত। তবে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের নেক তামান্না পূর্ণ করতে পেরেছি, হৃত স্বাধীনতাকে রুশদের কবল থেকে উদ্ধার করতে পেরেছি। এর জন্য আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানাই। কেউ আমাদের দিকে ফিরে তাকাক বা না তাকাক তাতে আমাদের কোন ক্ষোভ বা দুঃখ নেই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি,  স্বাধীনতা ও বিজয় আল্লাহর দান। আমরা আল্লাহর উপর ভরসা রাখি। তিনিই আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু-বিপদের একমাত্র সহায়।”

 

        রাষ্ট্রপতি জেনারেল জওহার দাউদের কথায় বড় করুণ ভাবে মুসলিম বিশ্বের প্রতি তার অনুযােগ ফুটে উঠেছে। কিন্তু সবচে বড় দুঃখের কথা, খৃষ্টান প্রজাতন্ত্র জর্জিয়া স্বাধীনতা ঘােষণার সাথে সাথে পশ্চিমা জগতসহ মুসলিম বিশ্ব ও রাতারাতি তার স্বীকৃতি দিলাে, জর্জিয়ার রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে সফরও করছে। ইতিমধ্যে সে ইসরাইলের সাথে সামরিক চুক্তিও করেছে। অথচ চেচিন রাষ্ট্র প্রধান জওহার দাউদ শুধু মাত্র উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা-মদীনার পূণ্যময় স্থানগুলােই যিয়ারত করার সুযােগ পেলেন। কোন মুসলিম রাষ্ট্র তাকে এ পর্যন্ত আমন্ত্রণও জানালাে না। একথা সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, রাশিয়া চেচিনকে পূর্ণ স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলে মুসলিম দেশগুলােও তার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিবে। কারণ সােভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর মুসলিম রাষ্ট্রগুলাে এখন আমেরিকার সামনে নতজানু হয়ে পড়েছে। আমেরিকার চোখ রাঙানির সামনে তারা নিজ উদ্যোগে কিছু করতে সাহস পাচ্ছে না। চাই তা যতই গুরুত্বপূর্ণ হােক না কেন। এটাও সত্য যে, ইসলামের দুশমন আমেরিকা রাশিয়ার মুকাবিলা করে কোন মুসলিম প্রজাতন্ত্রকে সাহায্য করবে না। তাই রাশিয়াকে তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেয়ার পূর্বে মুসলিম বিশ্বের পক্ষ থেকে স্বীকৃতির আশা করা দুরাশা নয় কি?

 

 ইসলামী শরীয়াতের পূর্ণ বাস্তবায়ন

        এ বছর পূণ্যময় রবিউল আউয়াল মাসে এক বৈঠকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের নেতাদের উপস্থিতিতে চেচিন রাষ্ট্রপ্রধান জেনারেল জওহার, দাউদ তাদের আয়ত্তাধীন সমগ্র এলাকায় ইসলামী বিধি-বিধান প্রয়ােগ ও তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। অবশ্য এর পূর্বেই চেচিন পার্লামেন্ট সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলাে যে, চেচিনের রাষ্ট্রীয় বিধান হবে “শরীয়াতে ইলামীয়াত" এবং তখন রুশ শাসনামলের সকল বিধি-বিধান বাতিল বলে ঘােষণ করা হয়। এ কারণেই কি পৃথিবীর অন্য কোন দেশ তাদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না?

 

        সৌদি আরবে ওমরা পালনার্থে জওহার দাউদ জেদ্দা পৌছলে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেনঃ “চেচিনের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণরূপে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত। ইসলামী আইন ও বিধি-বিধান ছাড়া সকল মতবাদ, সকল আদর্শ সেখানে অচল। কারণ ইসলামী বিধানই সার্বজনীন ও বিশ্বশান্তির একমাত্র পথ এবং সাম্যের মহিমায় ভাস্বর।

 

 

*****