JustPaste.it

ঐতিহাসিক উপন্যাস

 

পতনের ডাক

সাদেক হুসাইন সিদ্দিকী

        কীভাবে বোধ-উপলব্ধিহীন এক আয়েসী খলীফার অপরিণামদর্শী পদক্ষেপের কবলে শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী আব্বাসী খেলাফতের পতন ঘটল। কাদের ষড়যন্ত্রে একটি প্রতিষ্ঠিত বিশ্বশক্তি নিস্তানাবুদ হল। খেলাফতের মসনদ দখলের হীন উদ্দেশ্যে কারা আহ্বান করেছিল রক্তলোলুপ, অর্থলোভী চেঙ্গিস খাঁনকে। কত নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছিল খলীফা, শাহী খান্দান, আলেম-ওলামা ও লক্ষ কোটি মুসলিম জনতা। কত রক্ত প্রবাহিত হয়েছিল দসলায়। সেই মর্মন্তুত ইতিহাসের উপন্যাসিক রূপ- ‘পতনের ডাক’।

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

 

সুর ঝংকার

         শাহজাদা আহ্‌মার। সে মোসতানসের বিল্লাহর ভাই আফাজীর পুত্র। আর মোসতা'সেম বিল্লাহ হলো মোসতানসির বিল্লাহর পুত্র। এই মোসতাসেম বিল্লাহ হলেন বর্তমান খলীফা। আহ্‌মার হলো খলীফার চাচাত ভাই।

তার বাসভবন শাহী মহল 'কসরুল খুলদ'-এর সন্নিকটে। আহ্‌মাদ আবুল কাসেমের বাসভবনও তার বাসভবনের নিকটে। উভয় বাসভবনের মাঝে ছিল এক নয়নাভিরাম পার্ক, ফুলের বাগান। এর মাঝ দিয়ে কুল কুল রবে প্রবাহিত ছিল ঝর্ণাধারা। উভয় মহলের সীমানার মধ্যে ছিল সুন্দর সুন্দর ফল ও ফুলের বাগান। বাগানের ভিতর ছিল একাধিক ফোয়ারা। অফুরন্ত বিত্ত-বৈভবের মাঝে কাটত তাদের বিলাসী জীবন।

শাহজাদী নাজমা আহ্‌মারকে সন্ধ্যায় খানার দাওয়াত দিয়েছিল। সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর মাগরিবের নামায আদায় করে আহ্‌মার মহলের দিকে পা বাড়াল।

সূর্য ডুবার সাথে সাথে কৃত্রিম আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শাহী মহন। বাগানগুলোও আলোর বন্যায় উদ্ভাসিত।

আহ্‌মার বাগানের মধ্য দিয়ে মাঠের অপর প্রান্তে শাহী মহলের বেলকনিতে এসে দাঁড়ায়। বেলকনির উপর ছিল সাদা সিমেন্টের আন্তরণ। তার গা ঘেঁষে বেড়ে ওঠা উঁচু শাহী মহলগুলোও ছিল ধবধবে সাদা। বাগানের বিচ্ছুরিত আলোয় জ্বলজ্বল করছিল সাদা মহলগুলো। আহ্‌মার বেলকনি পেরিয়ে শাহী মহলে প্রবেশ করে একটা কক্ষ পেরিয়ে দিতীয় কক্ষে চলে আসে।

প্রতিটি কক্ষের দরজাগুলোয় ছিল ভারী রেশমী পর্দা। নিচে ছিল মূল্যবান কার্পেট। বিস্তীর্ণ ছাদ। সোনালী রং-এ উজ্জ্বল দেয়ালগুলো ডোরাকাটা- সবুজ, সোনালী ও উজ্জ্বল আকাশী রং। প্রতিটি কক্ষের ছাদ ও দেয়ালের রং ভিন্ন। দেয়ালের রংয়ের সাথে মানানসই করে ঝুলান হয়েছিল দরওয়াজার পর্দাগুলো।

প্রতিটি কক্ষ ছিল চীনা ফুলদানী ও সোনা-চাদীর বাহারী আসবাবপত্রে সুসজ্জিত। কক্ষপুলো এত বেশি আলোয় উদ্ভাসিত ছিল যে, সামান্য একটি সূচ পড়ে থাকলেও তা চোখে পড়ত।

            বহু দাসী ছিল এ মহলে। তারা ব্যস্ত ছিল বিভিন্ন কাজে।

আহ্‌মার দেখল, নাজমা এক কক্ষে বসে আছে। তার মাথায় শোভা পাচ্ছে সোনালী শাহী তাজ। পরণে কালো রেশমী পোষাক। গলায় ঝিলিমিলি মুক্তার হার। পরীর মত মনে হচ্ছে নাজমাকে। তার আয়নার মত উজ্জ্বল চেহারায় আলোর ঝলক  পড়ায় মনে হচ্ছিল, যেন বিদ্যুৎ খেলছে তার অবয়ব জুড়ে।

আহ্‌মারকে মিষ্টি চোখে দেখল নাজমা।মূদু হেসে তাকে হৃদয় নিংড়ানো অবিভাদন জানাল। পাশের একটি সোফায় বসল আহ্‌মার।

নাজমা কৌতুক করে বলল, মনে হয় খুব খিদে পেয়েছে তোমার।

আহ্‌মার রাসভারী কণ্ঠে বলল, ক্ষুধায় তাড়িয়ে আনেনি বটে। তোমার ‘চাঁদ মুখ’ দর্শনের আকর্ষণ আসতে বাধ্য করেছে।

আহ্‌মার শাহজাদী নাজমাকে ‘চাঁদ’ বলে ডাকে।

নাজমা বলল, ক্ষুধার্থ লোকটি কথা ঘুরিয়ে না বলে সরলভাবে বললেই ভাল লাগত।

আহ্‌মারঃ হৃদয়ের কথাই তোমাকে বলেছি। তুমি যদি আমার সামনে থাক, তবে বেঁহুশে খানার কথা ভুলে যাব বৈকি।

আহ্‌মারের কথায় নাজমা শরম পায়। সে আলোচনার বিষয় পাল্টিয়ে বলে, আমার বান্ধবী হাজেরা এখনি এসে গড়বে।

আহ্‌মার বলল, নাজমা, হাজেরার সাথে বেশি মাখামাখি কর না! সে ইবনে আলকামীর মেয়ে। ইবনে আলকামী ঘোর শিয়াগন্থী।

নাজমা বলল, তা জানি। ইবনে আলকামী ভাল লোক নয় তাও জানি। তবে হাজেরা সত্যই একটি ভাল মেয়ে।

আহ্‌মারঃ আমি শুনেছি, ইবনে আলকামী বিভিন্ন সময় শাহী মহলে এ কারণে লোক পাঠায়, তার ব্যাপারে কে কি বলে তা জানার জন্য।

নাজমাঃ আমি নিশ্চিত বলতে পারি, হাজেরা তার বাবার গোয়েন্দা নয়। তবে......

আহ্‌মার বলল, ‘তবে’ কি?

নাজমা বলল, তবে ইবনে আলকামী চাচ্ছে, নাজমার সাথে শাহজাদা আবু বকরের বিয়ে হয়ে যাক।

আবু বকর হলো মোসতা’সিম বিল্লাহর পুত্র।

আহ্‌মার বলল, আমি দু’একবার  হাজেরাকে দেখেছি। সে অত্যন্ত সুন্দরী। আবু বকর তাকে পছন্দ করতে পারে।

নাজমা বলল, সমস্যা হল, হাজেরা কামনা করছে ভাইজান আবুল কাসেমকে।

আহ্‌মারঃ আহ্‌মাদ আবুল কাসেমের সাথে হাজেরার বিয়েতে ইবনে আলকামী রাজী না-ও হতে পারে। সে ভাল করেই জানে, আবু বকরের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হলে একদিন সে দেশের রাণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

নাজমাঃ তুমি ঠিক বলেছ। খলীফা হয়তো ভাইজানের সাথে হাজেরার বিবাহে সম্মতি দিবেন না।

আহ্‌মারঃ খলীফা এক আশ্চর্য চরিত্রের লোক। তার ঐ যে কূপ......

কূপের কথা শুনতেই নাজমার চেহারায় পেরেশানী দেখা যায়। সে বলে, আল্লাহর দিকে চেয়ে আর কখনো কূপের কথা উল্লেখ করো না।

আহ্‌মারঃ ক্ষমা প্রার্থী। কূপের কথা উল্লেখ করে তোমাকে কষ্ট দিয়েছে। আর কখনো কূপের কথা বলব না।

এমন সময় হাজেরা এদের কক্ষে এসে দাঁড়ায়। তার পরণে ছিল অত্যন্ত মূল্যবান পোষাক ও চমৎকার অলংকার। মাথায় ছিল রাজকীয় তাজ। আসলেই হাজেরার চেহারা ছিল নিখুঁত এবং পরীর চেয়েও উজ্জ্বল। নাজমা হাজেরাকে সোৎসাহে অভিবাদন জানায়। উভয়ে এক সোফায় পাশাপাশি বসে যায়। হাজেরা আহ্‌মারকে বলে, দীর্ঘদিন গর আপনার সাথে মোলাকাত হল।

আহ্‌মারঃ সেও তো ঘটনাচক্রে এবং নাজমার কল্যাণে।

নাজমা এবার টিপ্পনি কেটে বলে, বহু আগেই তার ক্ষুধা লেগেছে। এখন যা-তা বলছে।

হাজেরাঃ আমারও ক্ষুধা লেগেছে।

নাজমাঃ ভাইজানের অপেক্ষা করছি।

আহ্‌মাদ আবুল কাসেম কক্ষে প্রবেশ করে বলে, আমিও এসে গেছি।

নাজমা বলল, ভাইজান তুমি বহু দেরী করে ফেলেছ।

আহ্‌মাদঃ হ্যাঁ, দেরী হয়ে গেছে। আজ শহরে এক দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে।

নাজমাঃ কি হয়েছে!

আহ্‌মারের পাশে সোফায় বসতে বসতে আহ্‌মাদ বলে, কি আর বলব; হাজেরা আবার কি মনে করে। ঘটনাটা খুবই দুঃখজনক।

হাজেরা বলল, এ দুর্ঘটনার কথা আমিও শুনেছি। শিয়া ও সুন্নীর মাঝে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছে। এখন তা ফাসাদে রূপ নিয়েছে।

কিছু শিয়া মনে করেছে, তারা যা করবে ইবনে আলকামী তাতেই সমর্থন জানাবে। তাদের এ ধারণা ভুল। বড় বেড়েছে তারা। বলল নাজমা।

আহ্‌মারঃ ঘটনাক্রমে আমি ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। ঝগড়াটা মারামারির দিকে গড়াচ্ছিল। আমি উভয় পক্ষকে বুঝিয়ে শান্ত করি। আমি এ সময় ওখানে না পৌঁছলে বড় কোন ফাসাদ ঘটার সম্ভাবনা ছিল।

নাজমাঃ আফসোস, কি হলো মুসলমানদের, তারা পরম্পরে মারামারি করে মরছে।

আজকের গন্ডগোলের সূত্রপাত ঘটিয়েছে কয়েকজন শিয়া। আমি আব্বার সাথে এ বিষষে আলোচনা করেছি। ওয়াদা করেছেন, তিনি শিয়াদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবেন। হাজেরা বলল।

আহ্‌মাদঃ এ ব্যাপারে তিনি আন্তরিক হলে কোথাও গন্ডগোল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

আহ্‌মারঃ এ প্রসঙ্গে আমি কিছু বললে হাজেরা মনে কষ্ট পাবে হয়তো। তাকে কষ্ট দিতে চাই না।

আমি কিছুই মনে করব না। যা বাস্তব ও সত্য, তা অকপটে প্রকাশ করতে হবে। বলল হাজেরা।

কিছু শিয়া চরম বাড়াবাড়ি করছে, তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে যেখানে সেখানে সুন্নীদের সমালোচনা করছে। অল্প সময়ের মধ্যে এমন কোন ফেৎনা ঘটার আশংকা রয়েছে, যাতে পুরো শহরবাসীর নিরাপত্তাহীনতায় নিক্ষিপ্ত হবে। আদৌ সুবিধা মনে হচ্ছে না পরিস্থিতি। আহ্‌মার ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল কথাগুলো।

আমি আব্বাকে জোর দিয়ে বলব, তিনি যেন যে কোন মূল্যে শিয়াদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন। হাজেরা বলল।

এমন সময় দাসীরা এসে খানা তৈরি হওয়ার কথা জানায়। চারজন উঠে খাবার কক্ষে গেল। বিরাট এক কক্ষ। এর দেয়াল লাল রংয়ের পর্দা এবং ছাদের রংও লাল। লাল দেয়ালের সাথে ঝুলান সাদা রেশমী কাপড়। গোল করে রাখা ছিল সোফাগুলো। সোফার সামনে টেবিল। টেবিলে বিছানো হয়েছে দস্তারখান। দস্তারখানার উপর রূপার পেয়ালা-পাত্রে হরেক রকম খাবার।

দাসীরা চিলমচী এনে তাদের হাত ধুইয়ে দেয়। সকলে খেতে শুরু করে।

খানা শেষে হাত ধুয়ে তোয়ালিয়ায় হাত-মুখ মুছে ওখান থেকে উঠে সামনের বড় এক কক্ষে যেয়ে সকলে বসেছে। ওখানে বেশ কয়েকজন অল্পবয়সী সুশ্রী দাসী সেজেগুজে অপেক্ষা করছে। তারা সেখানে পৌঁছতেই বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠে। একই সাথে তারা সুর করে গান ধরে।

আহ্‌মার চলে যেতে চাইল। আহ্‌মাদ তাকে যেতে দিল না।

আহ্‌মার বলল, আচ্ছা, তবে নামায পড়ে আসি।

নাজমা টিপ্পনি কেটে বলে, বহুত আচ্ছা মোল্লাজী।

সে নামায আদায় করে ফিরে এসে দেখে জবরদস্ত গান হচ্ছে। তাদের গান শেষ হলে সবাই বলে, এবার নাজমা ও হাজেরা দ্বৈত কণ্ঠে গান শুনাবে।

নাজমা ও হাজেরা প্রস্তুত হয়েছে। বাজনা শুরু হয়ে গেছে। উভয়ে এক সাথে গান গাচ্ছে। গানে গানে মাতিয়ে তুলেছে সবাইকে। গান শেষ হয়েছে। শুধু নিক্কন বাজছে। গানের ঝুমে আহ্‌মাদ এখনো দুলছে।

 

বনী বুইয়াহ্

          শাহজাদা আহ্‌মাদ আবুল কাসেম সত্য বলেছিল, 'শিয়া- সুন্নীর মাঝে দন্দ্ব হয়েছিল এবং তা সংঘাতের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছিল।'

হযরত মু'আবিয়া (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) এর মাঝেও এমনি এক দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত সংঘর্ষের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। দুনিয়ার মুসলমান দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। এক ভাগ পরিচিত হল শিয়ানে আলী নামে, দ্বিতীয় ভাগ শিয়ানে মু'আবিয়া নামে।

শিয়ানে আলী বলে যারা নিজেদের পরিচয় দিত এবং হযরত আলী (রাঃ)-র পক্ষে মিছিল করত, তারা আশ্চর্য ধরনের লোক ছিল। হযরত আলী (রাঃ)-এর উপর নাখোশ হয়ে তারা কেটে পড়ল। তবে তারা খামুশ রইল না। হযরত আালী (রাঃ)-এর সমালোচনা শুরু করল। কিছু লোক সমালোচনা করছিল মাত্রাতিরিক্ত। ইতিহাসে এরাই খারেজী নামে চিহ্নিত। বিভিন্নভাবে বহু প্রক্রিয়ায় তারা হযরত আলী ও হুসাইন (রাঃ)- কে কষ্ট দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এরাই তাদের শহীদ করেছিল।

তখন শিয়ানে আলী বলে যারা পরিচিত ছিল মুসলমানদের মতই তারা ধর্ম গালন করত। ধর্মীয় বিষয়ে পরম্পরের কোন পার্থক্য ছিল না বটে, তবে রাজনৈতিক বিরোধ ছিল চরম। খারেজী, শিয়া ও সুন্নী সকলে সেভাবেই অযু-গোসল করত, আযান দিত ও নামায আদায় করত যেভাবে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদায় করতেন।

রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়-আসয় নিয়েই ছিল দ্বন্দ্ব-এসব কারণেই একে অপরের চরম সমালোচনা করত। পরম্পরে দ্বন্দ্ব হলেও সকলে মসজিদে আসত, সবাই কুরআন তেলাওয়াত করত, আযান ও নামায আদায় করত একই নিয়মে। প্রায় তিন শ' বছর পর্যন্ত এতাবেই চলছিল উতয় দল। রাজনীতি ছিল তাদের দ্বন্দ্বের মূল কারণ।

বনী আব্বাসীয় খেলাফতের দুর্বলতা দুর্ভাগ্য বয়ে আনে। তখন আব্বাসীয় খেলাফত নামে মাত্র দাঁড়িয়ে আছে। সাম্রাজ্যের মূল নেতৃত্বে চলে আসে বনী বুইয়াহদের হাতে। আব্বাসীয় খলীফার দুর্বলতা ও পতন আঁচ করে তারা ধর্মীয় দ্বন্দ্ব উসকে দেয়। আলাদা মাযহাব হিসেবে শিয়ার আবির্ভাব ঘটে।

এই জঘন্য শিয়াতন্ত্রের সূচনা করেছিল মুয়িযযুদ্দৌলা বিন বুইয়াহ দাইলামী। সে ছিল আস-শুজা বুইয়াহ্‌-এর কনিষ্ঠ সন্তান। এই মুয়িযযুদ্দৌলা বাগদাদ দখল করে আব্বাসী খলীফা মুকতাদী বিল্লাহর চোখ উপড়ে ফেলে। তাকে জেলে বন্দী করে রাখে। তারই রাজাসনে উপবিষ্ট করায় পৃতুল খলীফা আবুল কাসেম ফযল বিন মুকতাদির বিল্লাহকে। এ ঘটনা ঘটে ৩৩৪ হিজরীতে। নতুন গদ্দীনিশীন পুতুল সুলতানকে খতীউল্লাহ খেতাবে ভূষিত করা হয়। মোয়েয়ুদুদৌলা খলীফার জন্য নির্দিষ্ট অংকের ভাতা জারি করে। খেলাফতের মূল কর্তৃত্ব সে নিজের হাতেই রাখে। নিজের নামেই মুদ্রা ছাপায়।

মুয়িযযুদ্দৌলা আপন নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের এই সুযোগে ক্ষমতাকে আরো পাকা করার বদনিয়াতে ধর্মীয় দ্বন্দ্ব উষ্কে দিয়ে নিজের পক্ষে লোক ভিড়ানোর হীন তংপরতায় মত্ত হয়। অনুকূল হাওয়া পেয়ে শ্রাবণের তুফানের মত ফুঁসে উঠে শিয়াবাদ। মুয়িযযুদ্দৌলা নিজেও ছিল শিয়া। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিকে মুখে মুখে হযরত আলী (রাঃ) তার ও আওলাদদের প্রতি সুধারণা প্রকাশ করত বটে। কিন্তু সুযোগমত আপন ভ্রান্ত ধারণার প্রকাশ ঘটিয়ে শিয়াদের সাথে একাত্ম হয়ে যায়।

লোকটা ছিল চরম অত্যাচারী ও খামখেয়ালী। সামান্য অপরাধে মানুষকে কঠিন শাস্তি দিত। তার জুলুম ও জবরদস্তিতে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। জনতা দারুণ ভয় করতে থাকে তার জুলুম ও রাজনৈতিক চালবাজীকে। এই বদবখত বাগদাদ জামে মসজিদের প্রধান দরওয়াজায় এই কথা লেখাবার দুঃসাহস দেখায়ঃ

“মু'আবিয়া, আবু বকর, ওমর ও ওসমানের উপর লানত বর্ষিত হোক।” নাউযুবিল্লাহ।

সে ভেবেছিল, লোক এরূপ লেখা দেখেও তার ভয়ে কিছু বলবে না। না, এই লেখা দেখেই জনতা তার এই ধৃষ্টতার প্রতিবাদ জানায়। তারা তৎক্ষণাৎ এই লেখা মুছে ফেলার দাবি জানায়। অল্প সময়ের মধ্যে এর প্রতিবাদে আগুনের মত জ্বলে উঠল পুরো শহর। শহরে দাঙ্গা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। পুতুল খলীফা খতীউল্লাহ তাকে বিষয়টা বুঝায়। কিন্তু সে বুঝার চেষ্টা করল না। সে জেদ ত্যাগ করল না। পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছিল প্রতি মুহূর্তে। উপায় না দেখে ওয়াজিরে আজম মুহাম্মদ বিন মাহদী-যিনি সুন্নী ছিলেন তিনি কৌশল করে তাকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, যদি ওটা মুছে এ বাক্যটি লিখে দেয়া হয়, তবে উভয় পক্ষের কারো আর প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকবে না। সে রাজি হল। পূর্বের লেখা মুছে মসজিদের প্রধান দরওয়াজার উপর লিখে দেয়া হলঃ

“মু'অবিয়া ও আহলে রাসূলের উপর যারা যুলুম করেছে তারা অভিশপ্ত।”

মুয়িযযুদ্দৌলার নাম ছিল আহমাদ। তার মধ্যে শিয়াপ্রীতি ছিল অতিমাত্রায়। দূর দূরান্তের শিয়ারা এ খবর শুনে তারা ব্যাপকহারে বাগদাদে এসে আস্তানা গড়ে। সে তাদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাপক সরকারী সুবিধা দিতে থাকে। দিন দিন শিয়াদের সংখ্যা বাড়তে থাকে বাগদাদে। শিয়ারা মুয়িযযুদ্দৌলাকে ধর্মীয় গুরু হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। ফলে সে যা বলত শিয়ারা তাই করত। তাদের প্রতি মুয়িযযুদ্দৌলার আর্থিক সহযোগিতা বাধ্য করেছিল তাকে সমর্থন করতে। এই অর্থ তদেরকে অন্ধ করেছিল সত্যের পথে চলতে।

হযরত ওসমান (রাঃ)-এর প্রতি মুয়িযযুদ্দৌলা চরম শত্রুতা ও ঘৃণা পোষন করত। তাই সে হযরত ওসমান (রাঃ)-এর শাহাদাত বরণের দিন-১৮-ই জিলহজ্বকে ‘ঈদে গদীর’ হিসেবে ঘোষণা করলে ভক্তরা সোৎসাহে তা পালন করে। সারা দিন তারা ঢোল-তবলা বাজিয়ে আনন্দ করে। খানা-পিনাসহ নাচ-গানের বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মদ পান চলে মাত্রা ছাড়িয়ে। ঐ দিন আনন্দে উৎফুল্ল ছিল শিয়াপন্থী মকল সদস্য। সে বছর থেকে শুরু হয় ‘ঈদে গদীর’ নামক অনুষ্ঠানের।

মুয়িযযুদ্দৌলা ছিল বাগদাদের দণ্ডমুণ্ডের মালিক। খলীফা ছিল তার ভাতাভোগী পুতুল। তবে সে-ই খলীফাকে যেহেতু রাজাসনে অধিষ্ঠিত করিয়েছিল, তাই খলীফা তার মতের উল্টা কিছু করত না। উল্টা করার মুরোদও তার ছিল না। “যাচ্ছে তাই করত মুয়িযযুদ্দৌলা। ইসলামী দুনিয়ায় তার নামে মুদ্রা জারী করা হল। সর্বত্র তারই নামে খুৎবা চলছিল। তার আকাক্ষা ছিল ইসলামী দুনিয়ার সব মানুষ তার অনুসরণ করুক। সবাই শিয়া হয়ে যাক।

 

দাঙ্গা-বাজ

      বনু বুইয়াদের শাসনামল ৩৩৪ হিজরীতে শুরু হয়ে ৪৪৭ হিজরীতে শেষ হয়। এই সোয়াশো বৎসরের ইতিহাস মুসলমানদের মাঝে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা, কপটতা ও নেফাকী সৃষ্টির ইতিহাস। এ দীর্ঘ সময় মুসলমানদের দু'টি দল শিয়া ও সুন্নির ঝগড়া-ফ্যাসাদ, বিবাদ-বিসম্বাদের কলংকময় ইতিহাস। হাঙ্গামা ও মারামারির সাথে সাথে উভয় দলে কপটতা ও নেফাকীরও চরম বিস্তার ঘটেছে।

ইতিহাস বলে, বুইয়া ছিল জেলের ছেলে। আহলে বাইতকে ভালবাসার দাবীদার শিয়ানে আলীর এক লোকের হাতে সে মুসলমান হয়েছিল। তাই তাকে শিয়া বলা হত। তার সন্তানরা উন্নতি করতে করতে শাসক পর্যন্ত হয়েছিল। রাজার আসন দখল করেছিল। কিন্তু আফসোসের কথা, বনু বুইয়ারা আহলে বাইতের সাথে কখনো সদাচারণ করেনি। তাদের মান- সম্মানের দিকে কখনো খেয়াল রাখেনি। রাজ্য পরিচালনায়, শাসন কার্যে তাদের কোন অংশ দেয়নি। তাদের কোনরূপ সহযোগিতাও করেনি। ওরা শুধুমাত্র মুখে মুখেই আহলে বাইতের মুহাব্বত আর ভালবাসার দাবীদার।

আসলে এটা ছিল তাদের এক প্রতারণা। এক ধোকাবাজী তারা মন দিয়ে আহলে বাইতকে মোটেও মুহাব্বত করত না। বরং মুখে মুখে তাদের ভালবাসার কথা প্রকাশ করে তারা আহলে বাইতের মুহাব্বতকারীদের সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করেছে। আর তারা তা হাসিল করেও নিয়েছে। তারাই মুসলমানদের মাঝে দু'টি দল সৃষ্টি করে একটি দলকে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় এতো শক্তিশালী করল যে, তারা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলামনদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছিল। তাদের উপর কথায় কথায় নির্যাতন চালাত। তাদের কোণঠাসা করে রাখত। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান পরস্পর ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত থাকবে আর তাদের হুকুমত ও রাজত্ব স্থায়ী হবে।

মুসলমানদের সরলতা ও অকপটতাকে পুজি করে তারা সোয়া শ' বৎসর মুসলমানদের শাসন করেছে। কিন্তু যারা মুসলামনদের মাঝে পরস্পর যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিদ্বেষের বীজ বপন করেছিল, একদিন তারা সেই কপটতার শিকার হল। কপটতা গৃহযুদ্ধের রূপ ধারণ করল। সেই গৃহযুদ্ধইই তাদের ধ্বংস করে। তারা রাজত্ব হারায়। তারা নির্বংশ হয়ে যায়। পৃথিবীর উপর কোন চিহ্নই আর অবশিষ্ট রইল না তাদের।

কিন্তু যে বিদ্আত, যে কুসংস্কার, যে আচার-আচরণ আর যে কুফুরী রসম-রেওয়াজ তারা রেখে গেছে, তা আজো মুসলমানদের মাঝে বিদ্যমান। আর সবচে বড় কথা হল, তারা মুসলমানদের মাঝে যে কপটতা ও নেফাকীর সৃষ্টি করেছে, তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে পেতে মুসলমানদেরকে দু'ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে।

বনু বুইয়াদের হুকুমত ধ্বংসের পর যদিও শিয়াদের সেই প্রভাব প্রতিপত্তিতে ভাটা পড়েছে, রাজক্ষমতা তাদের হাতছাড়া হয়েছে, কিন্তু তাদের সংখ্যাধিক্যের অহংকারে কারণে-অকারণে ঝগড়া-বিবাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হতো।

তারপর আব্দুল্লাহ আবু আহমদ খলীফা হয়ে মুসতাসিম বিল্লাহ উপাধী ধারণ করলে মানুষ ধারণা করল, হয়তো আব্বাসী খিলাফতের টলটলায়মান সিংহাসনটি আবার শক্ত পায়ে দাঁড়াবে। কিন্তু এই খলীফা ছিল ভীতু, নির্বোধ আর কুমতিপরায়ণ। সে মুয়িযযুদ্দীন ইবন্‌ আলকামীকে তার প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করল। ইবন্‌ আলকামী ছিল এক কট্ররপন্থী শিয়া। তবে অত্যন্ত সজাগ, দারুণ ধূর্ত। সে খলীফার উপর এমনিভাবে তার প্রভাব ফেলল যে, খলীফা তাকে খিলাফতের মালিক মোখতার বানাল। পরিশেষে এমন অবস্থা দাঁড়ালো যে, খলীফা শুধুমাত্র নামে মাত্র খলীফা রইল। আর ইবন্‌ আলকামীই খিলাফতের সকল কাজ পরিচালনা করতে লাগল। এতে শিয়ারা আবার উজ্জীবিত হল। আবার ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হল। প্রকাশ্যে সমালোচনা ও গালমন্দ করতে লাগল সুন্নীদের।

খিলাফত সম্পর্কেই দাঙ্গাবাজ শিয়ারা প্রশ্ন করত। তারা জলীলুল কদর সাহাবীদের নির্মল চরিত্রে জঘন্য ভাষায় আক্রমণ করত। মুয়িযযুদ্দৌলার পূর্বে অবস্থা এমন ছিল না, সে সময় পরস্পরে এ ধরনের কুৎসিত আলোচনা হত না, সে সময় দলাদলিও ছিল না। শুধুমাত্র মুসলমানরা দু'টি ভাগ হয়েছিল। তবে তাদের মাঝে রাজনৈতিক মতানৈক্য ছিল। কিন্তু মুয়িযযুদ্দৌলা এসে ভাদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করল। কাল পরিক্রমায় তা তীব্র আকার ধারণ করল। কারণ মুয়িযযুদ্দৌলার পর স্বার্থবাদী সেই সব লোক ক্ষমতায় এসেছিল, যারা নিজেদের ক্ষমতা প্রভাব ও প্রতিপত্তি বজায় রাখতে সেই হিংসা ও বিদ্বেষের জ্বলন্ত শিখায় আরো ইন্দন যুগিয়েছিল। পরিস্থিতি তারা বিস্ফোরন্মুখ করে তুলেছিল। এ সবই ছিল স্বার্থবাদীতার ফসল।

তবে উভয় দলেই কিছু চিন্তাশীল ও পরিণামদর্শী ব্যক্তি ছিল। যারা বাদানুবাদ ও ধ্বংসাত্নক কাজ থেকে স্বজনদেরকে নিজের দলের লোকদেরকে বারণ করত। কিন্তু কেউ তাদের কথা কানে তুলত না। তবুও তারা একত্রে বসে নিজেদের অদূরদর্শিতার কথা আলোচনা করত। শেষ পরিণতির কথা আলোচনা করত এবং আফসোস ও আক্ষেপ করত।

আসলে শিয়া-সুন্নি কোন বিষয় ছিল না। বরং উভয় দলের কিছু সন্ত্রাসী ও অজ্ঞ-গোঁয়ার লোকেরাই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করত। যে দ্বন্দ্ব প্রায়ই দাঙ্গার রূপ নিত। প্রধানমন্ত্রী  ইবন্‌ আলকামী জানতেন, যতদিন পর্যন্ত এই ফেতনা, এই দাঙ্গা-হঙ্গামা থাকবে, ততদিন পর্যন্ত তার ক্ষমতা থাকবে। আর আমীর-উমারা বা দরবারের অন্য কেউ এদিকে মনোযোগ দিবে না। তারা ভাববে, প্রধানমন্ত্রী আছেন। তিনি তো হুকুমত পরিচালনা করছেন। আমাদের এতে নাক গলানো উচিত হবে না। এ সুযোগে প্রধানমন্ত্রী শিয়াদের পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করতেন।

এক দিনের ঘটনা। এক সন্ত্রাসী শিয়া বাজার দিয়ে  যাচ্ছিল আর বলছিল, অভিশাপ তাদের উপর যারা আমীরের (হযরত আলী (রাঃ)-এর) হক লুটে নিয়েছে।

এক পৌঢ় শিয়া সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। সে তাকে ধমক দিয়ে বলল, কি বাজে কথা বলছ।

সন্ত্রাসী বলল, তবে কি তুমি সুন্নি, যে তোমার এ কথা ভাল লাগছে না? পৌঢ় শিয়া বলল, আমি সুন্নি নই শিয়া, তবে এ ধরনের কথা বলা উচিত নয়। এতে ঝগড়া-ফাসাদ আর সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়। সন্ত্রাসী বলল, নিজের পথ ধর। এ কথা বলার তোমার কি অধিকার আছে। পৌঢ় শিয়া চলে গেল। তখন আবার সন্ত্রাসী বলতে লাগল, মসজিদে মসজিদে ঘোষণা করে দাও যে, শিয়াদের আযান থেকে ভিন্ন আযান যেন মসজিদে দেয়া না হয়।

এক সুন্নী বলল, এ ধরনের কথা বলে কেন নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করছ? সন্ত্রাসী বলল, চুপ থাক। জান না, শাসন ক্ষমতা এখন আমাদের হাতে? সুন্নি বলল, শাসন ক্ষমতার গর্বে বাজে কথা বলছ কেন?

সন্ত্রাসী বলল, তোমাদের বুযু্র্গদের উপর লানত।

সুন্নী বলল, সাবধানে কথা বল। অন্যথায় থাপ্পর দিয়ে মুখ বাঁকা করে দিব। সন্ত্রাসী তো ঝগড়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। তাই সে সুন্নীকে একটি ঘুষি মারল। সু্ন্নীও ঘুষির জওয়াব ঘুষি দিয়েই দিল। তখন সন্ত্রাসী সেই শিয়া চিৎকার দিয়ে উঠল। “আমীর আলাইহিস সালামের দোহাই। অভিশপ্তরা আমাকে মেরে ফেলল।”

বাজারের সময় ছিল, তার চিৎকার শুনে কয়েকজন শিয়া দৌড়ে এসেই সুন্নীকে মারতে গুরু করল। কয়েকজন সুন্নীও এগিয়ে এলো। তারাও মারধর শুরু করল। দেখতে দেখতে বিরাট হাঙ্গামা। কয়েকজনের মাথা ফেটে গেল। হাত-পায়ে জখম হল। সারা বাজারে শোরগোল ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেল।

ঘটনাক্রমে সে দিক দিয়েই প্রধানমন্ত্রী মুয়ায়্যিদুদীন ইবন্‌ আলকামী কোথাও যাচ্ছিলেন। তার দেহরক্ষী একশ' সিপাহীও সাথে ছিল। তারা সবাই শিয়া ছিল। ইবন আলকামী ধমক দিল। সাথে সাথে মারামারি বন্ধ হয়ে গেল। তিনি বললেন, এটা কেমন নিলর্জ্জ আচরণ? সন্ত্রাসী সেই শিয়া দৌড়ে এসে ইবন্‌ আলকামীর সওয়ারীর পাদানী ঝাপটে ধরল। কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল, হুজুর! দেখুন এই বদমাশ সুন্নীরা আমাকে মারতে মারতে রক্তাক্ত করে ফেলেছে। তারা বলছে আমাদের শিয়াদেরকে বাগদাদ থেকে তাড়িয়ে দিবে।

ইবন্‌ আলকামী ক্ষিপ্ত হলেন। বললেন, সুন্নীদের শুনিয়ে দাও, বাগদাদে শিয়া থাকবে।সুন্নীরা বাগদাদ ছেড়ে চলে যাও।

একজন অত্যন্ত সনামধন্য সুন্নী অগ্রসর হয়ে বলল, এ ধরনের কোন কথা কোন সুন্নী বলেনি। আপনি তদন্ত করুন, এ ফিতনার কারণ কি?

ইবন্‌ আলকামী বললেন, আহলে বাইতের প্রেমিক মিথ্যা বলতে পারে না। এখানে যে সুন্নীরা আছে, তাদের গ্রেফতার কর।

সিপাইরা সব সুন্নীকে গ্রেফতার করল। ঘটনাক্রমে সেই পৌঢ় শিয়াও এসে পড়ল। যিনি সন্ত্রাসীকে উস্কানীমূলক কথা বলতে বারণ করেছিলেন। বুঝিয়েছিলেন এবং সবকিছু দেখেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, আমাকে জিজ্ঞেস করুন। এই ব্যক্তিটি, যে আপনার সাওয়ারীর পাদানী ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রথমে সুন্নীদের গালমন্দ করেছে। আমি তাকে বুঝিয়েছি, বারণ করেছি। তখন সে আমাকেও ধমক দিয়েছে।

ইবনে আলকামী বললেন, তুমি সাদাসিদে মানুষ। এসব কিভাবে বুঝবে? সুন্নীরা ফেতনাবাজ এবং ঘরে আগুন লাগিয়ে না দিলে এরা সত্যকে মানতে নারাজ।

স্বনামধন্য শিয়া বলল, আপনি প্রধানমন্ত্রী। ইনসাফ করুন।

ইবন্‌ আলকামী বললেন, চুপ কর। আমি ইনসাফই করছি।

সেই স্বনামধন্য শিয়া নীরব হয়ে গেলো। তখন ইবন্‌ আলকামী সিপাইদের বললেন, এই বদজাত সুন্নীদের টানতে টানতে নিয়ে চল।

সিপাইরা তাদের অত্যন্ত নির্দয়ভাবে টানতে টানতে নিয়ে চলল।

সন্ত্রাসী বলল, এখন মজা বুঝলে ত।

সেখানে শিয়ারাই বেশি ছিল। তারা বলল, সুন্নীদের জায়গা এখন জেলখানা। কিন্ত কিছু চিন্তাশীল বুদ্ধিমান শিয়াও সেখানে ছিন। তারা বলল, হায়! গৃহযুদ্ধের কারণে তো জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

আবু বকর

      সেই কূপের কথা প্রায়ই আহ্‌মারের মনে পড়ত। সে জানতে চেষ্টা করত, কেন কূপগুলো নির্মাণ করা হয় এবং কেন তা বন্ধ করে ফেলা হল। সে যখন নাজমার সাথে কূপের কথা তুলেছিল তখন নাজমা খুব পেরেশান হয়েছিল। তাই সে বুঝে ফেলেছিল, নিশ্চয় কূপগুলোকে নিয়ে কোন রহস্য আছে। সেই রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য সে অস্থির।

একদিন সে বসে বসে এই চিন্তাই করছিল। ইতিমধ্যে খলীফার উত্তরাধিকারী আবুবকর আসল। আহ্‌মার অত্যন্ত উষ্ণতার সাথে তাকে স্বাগতম জানাল। এক মূল্যবান সোফায় বসাল এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করল।

আবু বকরের বয়স অল্প। হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। স্বাস্থ্যবান। চেহারা, বীরত্ব ও দূরদর্শীতার আলামত বিকশিত। সে বলল, মোল্লাজ্বী, কি চিন্তা করছিলে?

আহ্‌মার রোজা-নামাযের খুব পাবন্দ ছিল। শাহী খান্দানের সবাই তাই তাকে মোল্লাজী বলে ডাকত। সে বলল, আমি এখন চিন্তা করছিলাম যে, নহরের পাড়ে কূপ কেন নির্মাণ করা হয়েছিল আবার কেন সেগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হল।

একথা বলার সময় সে আবু বকরের চেহারার দিকে দৃষ্টি রাখছিল। কূপের কথা শুনামাত্র সে পেরেশান হয়ে উঠল। বলল, আল্লাহ্‌র ওযাস্তে বলছি, ও কথা ভুলে যাও।

আহ্‌মার অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, তাহলে কি কূপগুলোকে ঘিরে কোন রহস্য লূকায়িত আছে?

আবুবকর বলল, আমি তো বললাম, কূপগুলোর আলোচনা করো না। কেউ জানে না যে, খলীফা কেন তা বানিয়েছেন। কূপগুলো নির্মাণকালীন সময়ে কাউকে সেদিকে যেতেও দেয়নি। সাধারণ লোকেরা কূপের কথা জানেও না। আহ্‌মার বলল, ভারি বিস্ময়কর কথা।

আবুবকর বলল, বিষয়টি বিস্ময়কর হোক যা হোক, তুমি মুখবন্ধ করে রাখ। শাহী খান্দানের অতি অল্প কয়েকজনই কূপ খননের কথা জানে। আর যারা জানে তাদেরকে মহামান্য খলীফা বলে দিয়েছেন যেন তারা কখনো এর আলোচনা না করে। সুতরাং তুমিও সে কথা ভুলে যাও।

আবু বকর বলল, আমি তোমাকে একটি কথা বলতে এসেছি।

আহ্‌মার তো বলার সাথে সাথে বলল, বলুন। অন্তরে এক আশংকায় ভীষণ আলোড়িত হচ্ছিল। সে কামনা করছিল, আবুবকর যেন নাজমার ব্যাপারে কোন আলোচনা না করে। সে তার দিকে দেখছিল। আবুবকর কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলল, আমি ইবন্‌ আলকামীকে বিশ্বাস করিনা।

আহ্‌মার বলল, আপকি কি ইবন্‌ আলকামী সম্পর্কে কিছু শুনেছেন? একথা বলে আহ্‌মার দীর্ঘশ্বাস নিল।

আবু বকর বলল, হ্যাঁ, সে কোন গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

চরম বিস্ময় ঝরে পড়লো আহ্‌মারের কণ্ঠে, বলল, ষড়যন্ত্র করছে! আবুবকর বলল, হ্যাঁ, আমার ধারণা তো তাই।

আহ্‌মার বলল, শুধুমাত্র ধারণাই।

আবু বকর বলল, হ্যাঁ শুধু ধারণা। তবে ও ধারণাকে নিশ্চয়তার পর্যায়ে মনে করতে পার।

আহ্‌মার বলল, এমন ধারনা কেন সৃষ্টি হয়েছে?

আবু বকর বলল, আমি তদন্ত করে দেখেছি যে, সে কতিপয় যুবককে ও কিছু নির্বোধ প্রকৃতির শিয়াকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করার জন্য নিযুক্ত করেছে। কারণে অকারণে তারা সুন্নীদের লক্ষ্য করে অকথ্য অশ্রাব্য কথা বলে এবং উভয় দলের মাঝে দাঙ্গার সৃষ্টি করে।

আহ্‌মার বলল, কিন্তু তার প্রমাণ কি?

আবু বকর বলল, শুনলাম গতকাল শফীক নামের এক সন্ত্রাসী অকারণে এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল। সেখানে ইবন্‌ আলকামীও এসে উপস্থিত হল। সে শফীকের পক্ষ নিয়ে অত্যন্ত উত্তেজনাকর কথা বলেছে। সুন্নিদের ঘরে ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছে। সেখানে যত সুন্নী একত্রিত হয়েছিল সবাইকে গ্রেফতার করে জেলখানায় পাঠিয়ে দিয়েছে।

এ সব শুনে আহ্‌মার বলল, আপনার চিন্তা সঠিক ও ধারণা বাস্তব! এ ঘটনায় শিয়ারাও নির্দোশ সুন্নীরাও নির্দোষ। সবকিছু ঘটাচ্ছে ইবন্‌ আলকামী নিজে। সে কিছু মন্ত্রী লানন করছে। তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সে চাচ্ছে দেশময় দাঙ্গা ও বিশৃংখলার সৃষ্টি করতে।

আবু বকর বলল, ইতিপূর্বে আমি মুয়ায়্যিুদ্দীন ইবন আলকামীর এ ধরনের কর্মকান্ডের কথা শুনেছি। তবে তা সুন্নীদের থেকে শুনেছি। তখন ধারণা করেছিলাম যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শিয়া তাই তারা তার বিরুদ্ধে লেগেছে। আমি তাদের কথার তেমন গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু গতরাতে হাসান আসাদ, যিনি অত্যন্ত বুযুর্গ ব্যক্তি; শিয়ারাও তাকে সম্মান করে সুন্নীরাও তাকে সম্মান করে। তিনি এসে আমাকে শফীকের সন্ত্রাসী ও ইবন্‌ আলকামীর বাড়াবাড়ির কতা শুনালেন। তিনি আমাকে বললেন, তিনি নিজে ইবন্‌ আলকামীর নিকট শফীকের সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপের কথা বলেছেন। কিন্তু ইবন্‌ আলকামী তাকে ধমকিয়ে নীরব করে দিয়েছে।

আহ্‌মার বলল, হাজেরা আমাকে বলেছিল একদিন। যে, কিছু শিয়া সন্ত্রাসী ফিতনা শুরু করে দিয়েছিল, তখন সে তার পিতাকে তাদের সম্পর্কে বুঝিয়েছিল। আর তার পিতা বলেছিল, আমি তাদেরকে বুঝিয়ে দিবো।

আবু বকর বলল, হাজেরা অত্যন্ত ভাল মেয়ে। আমি জেনেছি যে, ইবন্‌ আলকামী আমার সাথে তাকে বিয়ে দিতে চায়। সুন্দরী, রূপসী-পরিচ্ছন্ন, হৃদয়। আমি আনন্দের সঙ্গেই তাকে আমার জীবন সঙ্গীনী হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু আমি জানতে পেরেছি সে ভাই আহমদ আবুল কাশেমকে ভালবাসে। আর আহমদও তার প্রেমে বিভোর। তাই এখন আমি হাজেরাকে আমার বোন মনে করি।

আহ্‌মার বলল, আপনি পরিচ্ছন্ন মনের মানুষ। শাহজাদী নাজমাও আপনার প্রশংসা করেন।

আবু বকর মৃদু হাসতে হাসতে আহ্‌মারের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল, আমি জানি, নাজমার মন তোমার দিকেই। তুমি অত্যন্ত ভাগ্যবান। নাজমা অনিন্দ সুন্দরী, বাগদাদের অপ্সরী। যে তাকে একবার দেখেছে সে তাকে ভালবেসেছে। সে তোমাকে কামনা করে আর তুমি ..... অবশ্যই।

আহ্‌মার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, পরিস্কার কথা, আমিও তাকে ভালবাসি।

আবু বকর বলল, একথা জানি এবং বুঝি, নাজমা এমন এক রূপবতী সুন্দরী, যাকে হৃদয় অবলীলায় ভালবাসতে চায়।

আহ্‌মারের সন্দেহ হল। ভাবতে লাগল, সে যেন তার প্রেমাস্পদের সাথে প্রেম না করে বসে এবং উত্তেজিত হয়ে তাকে ভালবাসতে নিষেধ না করে দেয়। তাই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আবু বকর বলল, আমি তোমাকে আমার ভাই মনে করি আহ্‌মার! আমি বলতে পারব, এখন তোমার অন্তরে কোন কথাটি ঘোরপাক খাচ্ছে। আমি জানি এখন তুমি কি চিন্তা করছ। নিশ্চিত থাক। আমি নাজমাকে যন্ত্রণায় ফেলব না। যদিও আমি জানি, আমি চাইলে নাজমার সাথে আমার বিবাহ অত্যন্ত সহজেই হয়ে যাবে। কিন্তু আমি দু'টি মিলিত হৃদয়ের বিচ্ছেদ কামনা করি না।

আহমার কৃতজ্ঞাতায় ভরা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কিভাবে আপনার কৃতজ্ঞতা আদায় করব।

আবু বকর বলল, এটা কৃতজ্ঞতা জানানোর কোন বিষয় নয়। আমিও একজনকে চাই।

আহ্‌মার বলল, সে সৌভাগ্যের অধিকারিনী কে?

আবু বকর বলল, এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে।

আহ্‌মার বলল, আপনি তাকে কোথায় দেখেছেন।

আবু বকর বলল, একদিন রাতে আমি দজলার তীরে দাঁড়িয়েছিলাম। জ্যোস্নাভরা রাত। প্রদীপ আর চাঁদের আলোয় দিনের মত মনে হচ্ছিল পুরো জনপদ। ইতিমধ্যে একটি বজরা এসে ভীড়ল। বজরা থেকে এক যুবতী নামল। অত্যন্ত সুন্দরী ও রূপবতী-যেন পরী। আমি তার সৌন্দর্য ও রূপে মোহাবিষ্ট হয়ে গেলাম। আমি তাকে দেখলাম। সেও আমাকে দেখল। তার দৃষ্টির তীর আমার হৃদয়ের মর্মমূলে বিদ্ধ হল। নিকটে তার গাড়ী দাড়ানো ছিল। সে তাতে চড়ে চলে গেল। সারারাত আমাকে সেই বিমু্গ্ধকর মেয়ের দৃশ্য কষ্ট দিল। তার কয়েকদিন পরের ঘটনা। আমি একাকী দজলার তীর ধরে কোথাও যাচ্ছিলাম। এক বাগান থেকে মধুর কলকণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসছে। আমি বাগিচার দরজায় পৌঁছলাম। হঠাৎ আমার সম্মুখে এক নারী মূর্তি উপস্থিত। আমি চেয়ে দেখি, এই সেই মোহময়ী যে আমার রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল।

আমি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলাম। সে লজ্জাজড়িত কণ্ঠে স্পষ্ট ভাষায় আমাকে বলল, 'উহু আপনি'! আমার মনে হল যেন ফেরদাউস জান্নাতের হুর আমার সামনে। সে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করল। আমার পরি

পরিচয় জানতে চাইল। তবে আমি তাকে বলিনি যে, আমি খলীফার উত্তরাধিকারী। তার নাম জিজ্ঞেস করলে বলল, ফেরদাউস এক জমিদারের কন্যা। আমি তার বাড়ির ঠিকানাও জিজ্ঞেস করে নিয়েছি। এ পর্যন্ত কয়েকবার তার সাথে সাক্ষাৎও হয়েছে।

আহ্‌মার বলল,আরে! চমৎকার কাহিনী তো!

আবু বকর বলল, আমার মন চায় আমি তাকে বলে দেই যে, আমি কে? কিন্তু ভয়ের বিষয় যে ও কথা বলতে আমার সাহস হয় না। যদি সে আমার পরিচয় পেয়ে ভরকে যায়!

আহ্‌মার বলল,আমার মনে হয়, তার নিকট আপনার ব্যাক্তিত্ব স্পষ্ট হওয়া দরকার।

আবু বকর বলল, চেষ্টা করব।

আহ্‌মার বলল, একদিন তাকে আপনার শাহী মহলে দাওয়াত দিন।

আবু বকর বলল, যদি তুমি নাজমাকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও তাহলে সে-ই সুন্দরীকে রাজ প্রসাদে নিয়ে আসতে পারবে। ও সময় নাজমা ও আহমদ এসে দাঁড়ালে তারা উভয়ে তাদেরকে স্বাগতম জানায়। (চলবে)

অনুবাদঃ নাসীম আরাফাত